ভেতর থেকে ভাঙছে দেশ:অপরাধের ঢেউয়ে ডুবছে বাংলাদেশ — সংখ্যার পেছনে মানুষের মুখ

আট বছরের শিশুর কাটা গলা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকার রক্তাক্ত অফিস — সহিংসতা এখন আর অস্বাভাবিক নয়। আর সংখ্যাগুলো বলছে, এটা আরও খারাপ হচ্ছে।

৫০ ১৫ দিনে সারা দেশে হত্যাকাণ্ড

৪৫ শুধু ফেব্রুয়ারিতে ধর্ষণের ঘটনা

২৩৬ ফেব্রুয়ারিতে নির্যাতিত নারী ও শিশু

বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে কাটা গলা নিয়ে আট বছরের কোনো শিশু হেঁটে বের হয়ে আসবে — এমন কথা কেউ ভাবে না। অথচ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ঠিক তা-ই ঘটেছে। ইকো পার্কে যৌননিপীড়নের পর শ্বাসনালি কেটে দেওয়া হয় ওই শিশুটির। তবুও সে অর্ধনগ্ন, রক্তাক্ত অবস্থায় হেঁটে বেরিয়ে আসে। মানুষ তাকে দেখেছে। হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাঁচানো যায়নি। সোমবার রাতে মারা যায় সে। বয়স মাত্র আট।

এটাই এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে কঠিন গল্প — একটি পার্কে একজন দানবের গল্প নয়, বরং আরও গভীর, জটিল এবং সারিয়ে তোলা অনেক কঠিন একটি সত্যের গল্প। এমন একটি দেশের গল্প, যেখানে সহিংসতা এখন পরিসংখ্যানের ভাষায় “স্বাভাবিক” হয়ে উঠছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাপঞ্জি

  • সীতাকুণ্ড
    চট্টগ্রামসরকারি ইকো পার্কের ভেতরে ৮ বছরের শিশুকে যৌননিপীড়নের পর শ্বাসনালি কাটা হয়। শিশুটি রক্তাক্ত অবস্থায় হেঁটে বের হলেও সোমবার রাতে মারা যায়।
  • ঈশ্বরদী
    পাবনাঅপহরণে বাধা দেওয়ায় দাদিকে কুপিয়ে জখম করা হয়। ১৫ বছরের নাতনিকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।
  • ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
    কুষ্টিয়ানিজের অফিসে কর্মচারীর এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে খুন হন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষিকা।
  • গোবিন্দগঞ্জ
    গাইবান্ধাপুলিশের পোশাক পরে সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা চালককে মারধর করে ইজিবাইক ছিনতাই করে। যাত্রীর কাছ থেকে ৭৫ হাজার টাকা ও মোবাইল নিয়ে যায়।
  • পল্টন মোড়
    ঢাকাচলন্ত রিকশায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীর কানের দুল হ্যাঁচকা টানে ছিনিয়ে নেওয়ায় কানের লতি ছিঁড়ে গুরুতর জখম হন তিনি।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, শুধু ফেব্রুয়ারিতেই ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে তিনজনকে। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১০ জন নারী ও কন্যাশিশু। মোট ৪৫টি ধর্ষণের ঘটনায় ৫২ শতাংশই শিশু ও কিশোরী। সারা দেশে ২৩৬ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। পারিবারিক সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪১ জন নারী। রাজনৈতিক সহিংসতায় মারা গেছেন ১০ জন, আহত হয়েছেন ১ হাজার ৯৩৩ জন।

“তিন কারণে বাড়ছে নৃশংসতা — আইনের শাসনে ঘাটতি, সামাজিক অবক্ষয়, এবং আর্থিক বা রাজনৈতিক প্রভাবে দায়মুক্তি পাওয়ার প্রবণতা। এগুলো নিয়ন্ত্রণ না হলে নৃশংস ঘটনা আরও বাড়বে।”

সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বিষয়টি স্পষ্টভাবে বলেন: দায়মুক্তিই সহিংসতার ইন্ধন। যখন মানুষ বিশ্বাস করে — এবং বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণও আছে — যে সঠিক পরিচয় বা সঠিক পরিমাণ টাকা থাকলে যেকোনো মামলা মিলিয়ে যায়, তখন আইনের প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে পড়ে। পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজি খন্দকার রফিকুল ইসলামও স্বীকার করেন, “নৈতিকতার অবক্ষয় রোধে উদ্যোগ নিতে হবে। পুলিশের এককভাবে কিছু করার নেই।

রাস্তার অপরাধ আরেকটি সমান্তরাল চিত্র তুলে ধরছে। শুধু ঢাকায় ফেব্রুয়ারিতে ছিনতাই ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে। ডিএমপির সব থানা মিলিয়ে এ মাসে ৩০৮টি ছিনতাইয়ের ঘটনা রেকর্ড হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রকৃত সংখ্যা এর কয়েক গুণ বেশি — কারণ বেশিরভাগ ভুক্তভোগী অভিযোগই করেন না। ছিনতাইকারীরা এখন সংগঠিত, গতিশীল এবং ক্রমশ সাহসী হয়ে উঠছে — মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, এমনকি মাইক্রোবাস ব্যবহার করে দিনদুপুরে অপরাধ ঘটাচ্ছে।

ছিনতাইকে এখনো বড় কোনো অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় না। যারা গ্রেপ্তার হয়, তারা আদালত থেকে দ্রুত জামিনে বেরিয়ে একই অপরাধে জড়াচ্ছে।

জামিন ব্যবস্থা এখানে বিশেষভাবে সমস্যাজনক। ছিনতাই — সহিংস হোক বা না হোক — কদাচিৎ কাউকে বেশিক্ষণ হাজতে রাখে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেশিরভাগ ছিনতাইকারীই নেশাগ্রস্ত এবং নেশার টাকা জোগাতে এ পথ বেছে নেয়। চক্রটা সহজ — গ্রেপ্তার, জামিন, আবার একই কাজ। ড. হক বলেন, “ছিনতাইকে বড় অপরাধ হিসেবে না দেখা পর্যন্ত শুধু টহল বাড়িয়ে এ ধারা থামানো যাবে না।”

বাস্তবে বাংলাদেশ এখন নিজেকেই প্রশ্ন করছে — কেমন সমাজ চায় সে, আর সেই দায়িত্ব কার? পুলিশ প্রধান ভার্চুয়াল বৈঠক করতে পারেন। বইমেলায় অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করা যায়। কিন্তু একটি শিশু কাটা গলা নিয়ে পার্ক থেকে হেঁটে বেরিয়ে এসেছিল — আর কেউ তা আটকাতে পারেনি। তার গল্পের পেছনে আরও ডজনখানেক গল্প আছে। এবং সেসব গল্পের পর যে প্রশ্নটি থেকে যায়, কোনো সংবাদ সম্মেলনে তার উত্তর এখনো মেলেনি: এটা বারবার কেন হচ্ছে?

Share This News