তারা তাঁবুতে ঘুমাচ্ছিল। তারপর দ্বিতীয় ক্ষেপণাস্ত্রটি আঘাত করল।

বৈরুতের সমুদ্রতীরে বাস্তুচ্যুত পরিবারদের তাঁবু ক্যাম্পে ইসরায়েলের “ডাবল-ট্যাপ” হামলা — নিহত ৮, আহত ৩১। যাদের যাওয়ার আর কোনো জায়গা ছিল না।

জায়গাটা একটু নিরাপদ হবে — এই ভরসাতেই তারা এসেছিল। লেবাননের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক বোমাবর্ষণে যারা ঘরবাড়ি হারিয়েছিলেন, তারা এসে তাঁবু গেড়েছিলেন বৈরুতের সমুদ্রতীর — রামলেত আল-বাইদায়। এই এলাকা সাধারণত ইসরায়েলের হামলার লক্ষ্যবস্তুর বাইরে। রাতে তারা ঘুমাচ্ছিলেন।তারপর যুদ্ধবিমানের শব্দ এলো।

আল জাজিরার সংবাদদাতা হেইডি পেটকে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ভোররাতে বিমানের গর্জনে তাদের ঘুম ভেঙে যায়। প্রথম বিস্ফোরণ হলো। কিছু মানুষ হতবিহ্বল হয়ে তাঁবুর বাইরে মাথা বের করলেন — ঠিক তখনই দ্বিতীয় আঘাত এলো।

এটাই “ডাবল-ট্যাপ” কৌশল। প্রথম হামলার পর যারা উদ্ধারে ছুটে আসেন বা বেঁচে থাকা মানুষগুলো — তাদেরকেই দ্বিতীয় হামলায় নিশানা করা হয়।

আট জন নিহত হলেন। একত্রিশ জন আহত। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সংখ্যাটি নিশ্চিত করেছে।


এই হামলায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হলো — হামলার স্থান। সংবাদদাতা পেট জানান, এই এলাকা ইসরায়েলের ঘোষিত সরিয়ে যাওয়ার নির্দেশের বাইরে — অর্থাৎ বেসামরিক মানুষের কাছে সতর্কবার্তারও কোনো সুযোগ ছিল না।

তিনি বলেন, “এগুলোকে প্রায়ই নির্ভুল হামলা বলা হয়। কিন্তু আজ রাতের হামলায় ৩১ জন আহত ও আট জন নিহত হয়েছেন। এখানে এমন বহু বাস্তুচ্যুত মানুষ আছেন যাদের যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই।”

আল জাজিরার আরেক সংবাদদাতা জেইনা খোদর এই হামলাকে বললেন “উল্লেখযোগ্য মাত্রায় উত্তেজনা বৃদ্ধি।”


বৃহস্পতিবারের ঘটনা শুধু এটুকুতেই শেষ নয়। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ইসরায়েলের আরও হামলায় অন্তত সাত জন নিহত হয়েছেন। তায়ার জেলার বুর্জ শামালিতে একজন মা ও তার তিন ছেলে মারা গেছেন। বালবেক জেলার শাথ শহরে নিহত হয়েছেন আট জন। বৈরুতের দক্ষিণে আরামুনে নিহত তিন জন, একটি শিশু আহত। দেইর আনতারে নিহত দুই জন — সেখানে চারতলা একটি ভবনে হামলা হয়েছে, উদ্ধারকাজ এখনও চলছে।

২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৩৪ জনে।


অন্যদিকে, হিজবুল্লাহ বুধবার রাত ৮টার দিকে ইরানের সঙ্গে সমন্বিতভাবে উত্তর ইসরায়েলে প্রায় ১০০টি রকেট ছোড়ে — এই সংঘাত শুরুর পর থেকে এটিই সবচেয়ে বড় একক হামলা। ইসরায়েলের চ্যানেল ১৪ একে “অলৌকিক” বলেছে যে কেউ হতাহত হননি, তবে কিছু ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করা হয়েছে। এই হামলায় লক্ষাধিক ইসরায়েলিকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হয় — যা ইসরায়েলি সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবেও সংবেদনশীল বিষয় হয়ে উঠেছে।

হিজবুল্লাহ একাধিক ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবিও করেছে, যার মধ্যে রয়েছে মেরন এয়ার অপারেশনস কমান্ড বেসের একটি রাডার স্টেশন।


তবে এই যুদ্ধের ভারসাম্যহীনতা একটি সংখ্যাতেই স্পষ্ট — যুদ্ধ শুরুর পর থেকে লেবাননে ৭ লাখ ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, আর লেবাননে এ পর্যন্ত মাত্র দুইজন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন।

বৈরুতের ওই সমুদ্রতীরে যারা তাঁবু গেড়েছিলেন, তারা যোদ্ধা ছিলেন না। তারা ছিলেন সেই মানুষ, যারা নিরাপদ জায়গার সন্ধানে ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। গতরাতে, তাদের শেষ আশ্রয়টুকুতেও বোমা পড়ল — দুইবার।


সূত্র: আল জাজিরা

Share This News