বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়: জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত ড. খলিলুর রহমান

দীর্ঘ চার দশক পর বিশ্ব কূটনীতির সর্বোচ্চ মঞ্চে আবারও উড়ল বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (UNGA) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এক নির্বাচনে সাইপ্রাসের প্রার্থীকে হারিয়ে তিনি এই মর্যাদাপূর্ণ পদে জয়লাভ করেছেন। আগামী সেপ্টেম্বর মাসে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এক বছরের জন্য এই গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করবেন।

নির্বাচনের চিত্র

গত ২ জুন (মঙ্গলবার) নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে ১৯০টি সদস্য রাষ্ট্রের উপস্থিতিতে এই ঐতিহাসিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। গোপন ব্যালটের এই ভোটে ড. খলিলুর রহমান পান ৯৯টি ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস এস. কাকোরিস পান ৯১টি ভোট। সাইপ্রাস যেখানে প্রায় এক দশক ধরে এই পদের জন্য প্রচারণা চালিয়ে আসছিল, সেখানে স্বল্প সময়ের সুসংগঠিত কূটনৈতিক প্রচারণায় বাংলাদেশের এই বিজয় আন্তর্জাতিক মহলে চমক সৃষ্টি করেছে।

কেন এটি বাংলাদেশের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ?

এটি বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি নির্বাচন নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে এক বিশাল স্বীকৃতি। এর আগে মাত্র একবারই বাংলাদেশ এই সম্মান পেয়েছিল—ঠিক ৪০ বছর আগে, ১৯৮৬ সালে, যখন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী ৪১তম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছিলেন। দীর্ঘ চার দশক পর ড. রহমানের এই বিজয় প্রমাণ করে যে, বৈশ্বিক শান্তি ও বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের ভূমিকার ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গভীর আস্থা রয়েছে।

বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ, জলবায়ু সংকট এবং ভূ-রাজনৈতিক বিভাজনের এই কঠিন সময়ে তাঁর এই বিজয়কে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্বনেতারা। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ড. রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন, তাঁর এই দায়িত্ব গ্রহণ বহুপাক্ষিক বৈশ্বিক সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করবে।

সভাপতির মূল দায়িত্ব ও লক্ষ্য

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি কোনো সরাসরি নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ না করলেও বৈশ্বিক এজেন্ডা নির্ধারণ, বিতর্ক পরিচালনা ও বিশ্বনেতাদের মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তোলায় তাঁর ভূমিকা অপরিসীম। দায়িত্ব গ্রহণের পর এক আবেগময় ভাষণে ড. রহমান জানান, তিনি অত্যন্ত বিনীতভাবে এই বিশাল দায়িত্ব নিচ্ছেন।

তিনি বলেন, “এমন এক সময়ে জাতিসংঘ নতুন দশকে পদার্পণ করছে, যখন বিশ্বজুড়ে এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা একটি বড় পরীক্ষার মুখে।” তাঁর মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে—শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনকে ত্বরান্বিত করা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা এবং প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈশ্বিক সুশাসন নিশ্চিত করা।

কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতার প্রতিচ্ছবি

ড. খলিলুর রহমানের এই আন্তর্জাতিক বিজয় কিন্তু হঠাৎ করে আসেনি; বরং এটি তাঁর দীর্ঘ চার দশকের বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের এক অনন্য স্বীকৃতি। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ ফরেন সার্ভিসে যোগ দিয়ে শুরু হয়েছিল তাঁর এই পথচলা। এরপর জাতিসংঘের জেনেভা ও নিউইয়র্ক দপ্তরে দীর্ঘ ২৫ বছর অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কাজ করেছেন তিনি।

বিশ্ব কূটনীতির এই চড়াই-উতরাই পার হয়ে, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা বিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি হিসেবেও তিনি তাঁর অসামান্য যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন।

খবরের কাগজের ভাষায় বলতে গেলে—যাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় কেটেছে বৈশ্বিক কূটনীতির মারপ্যাঁচ আর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অলিগলিতে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মতো সর্বোচ্চ মঞ্চে তাঁর হাতে সভাপতির হাতুড়ি ওঠা যেন এক অবধারিত পাওনা ছিল। ড. রহমানের এই বিশ্বজয় তাই শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো এক নতুন বাংলাদেশেরই গল্প।

Share This News