খুলনায় চাঁদাবাজি, মাদক আর সন্ত্রাস দমনে পুলিশ, র্যাব ও এপিবিএন-এর সমন্বয়ে যৌথ বাহিনীর যে বিশেষ অভিযান চলছে, তা নিয়ে একটু যৌক্তিকভাবে চিন্তাভাবনা করার সুযোগ রয়েছে। কাগজে-কলমে এটি একটি বড় উদ্যোগ হলেও, গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে এই অভিযানের কার্যকারিতা নিয়ে বেশ কিছু গুরুতর প্রশ্ন সামনে আসে।
পরিসংখ্যানের গোলমাল ও আসল সত্য
প্রতিবেদনটি সতর্কতার সাথে পড়লে একটি বড় অসংগতি চোখে পড়বে। কেএমপি সূত্র শুরুতে বলছে, ৩ জুন থেকে মোট ১৮৪ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। কিন্তু পরের লাইনেই বলা হচ্ছে—প্রথম দিন ৬৩ জন, দ্বিতীয় দিন ৫৯ জন এবং তৃতীয় দিন ১০০ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। এই তিনটি সংখ্যা যোগ করলে দাঁড়ায় ২২২ (৬৩ + ৫৯ + ১০০ = ২২২), যা পুলিশ কমিশনারের দাবির সাথে মিলে যায়। এই ধরনের অগোছালো তথ্য অনেক সময়ই প্রমাণ করে যে, মাঠপর্যায়ের কাজের চেয়ে সংখ্যার হিসাব মেলানোর দিকেই মনোযোগ বেশি।
সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, এই ২২২ জনের তালিকায় শীর্ষ বা তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে। ধরা পড়ছে মূলত ছিঁচকে চোর, এবং খুচরা মাদক বিক্রেতারা (যাদের কাছে হয়তো দু-এক পুড়িয়া গাঁজা বা ইয়াবা পাওয়া যাচ্ছে)।
কেন ব্যর্থ হচ্ছে এই অভিযান?
- তথ্য ফাঁস: সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হলো সর্ষের ভেতরের ভূত। যৌথ বাহিনী কখন, কোথায় অভিযান চালাবে, সেই খবর আগেভাগেই সন্ত্রাসীদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। ঢাকঢোল পিটিয়ে অভিযান চালালে শীর্ষ অপরাধীদের আত্মগোপনে চলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।
- দায়সারা গোছের কাজ: শেখপাড়া বা সোনাডাঙ্গার স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, এই অভিযানগুলোর প্রভাব খুবই ক্ষণস্থায়ী। পুলিশ স্পটে আসার আগে মাদক কারবারিরা সরে যায়, আবার পুলিশ চলে যাওয়ার আধা ঘণ্টার মধ্যেই তারা ফিরে এসে স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু করে। এর মানে হলো, প্রশাসনের নজরদারির ভেতরে এক ধরনের বিশাল ফাঁকফোকর রয়ে গেছে।
নাগরিক সমাজের উদ্বেগ কতটা যৌক্তিক? খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব বাবুল হাওলাদারের মন্তব্যটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। পুলিশের কাছে যখন শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা আগে থেকেই রয়েছে, তখন তাদের বাদ দিয়ে শুধু চুনোপুঁটিদের ধরে হাজত ভরানোকে সাধারণ মানুষ ‘আইওয়াশ’ ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারছে না। অস্ত্রধারী এবং মূল হোতাদের না ধরলে সমস্যার শেকড় কখনোই কাটা পড়বে না।
প্রশাসনের বক্তব্য বনাম বাস্তবতা কেএমপি পুলিশ কমিশনার মো. জাহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন যে লিটন, রিফাত, আজম খানসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। চেকপোস্ট বসানো বা জামিনে বের হওয়া আসামিদের ট্র্যাকিং করা অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। তবে, যতক্ষণ না পর্যন্ত প্রশাসনের ভেতর থেকে তথ্য পাচার বন্ধ হচ্ছে এবং আসল রাঘববোয়ালদের আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে, ততক্ষণ এই ধরনের বিশেষ অভিযানগুলো থেকে দীর্ঘমেয়াদী কোনো সুফল আশা করা যায় না।
যেকোনো সফল অভিযানের মূল শর্ত হলো গোপনীয়তা এবং নিখুঁত পরিকল্পনা। সেই জায়গায় একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আনা এখন সময়ের দাবি।