জলবায়ু বিপর্যয়ে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি: টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিতে তরুণদের সম্পৃক্ততা জরুরী।

শাওন মিয়া, শিক্ষার্থী, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ, ঢাকা; ২১ এপ্রিল, ২০২৬

বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই গভীর ও বহুমাত্রিক আকার ধারণ করছে। এটি এখন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; বরং জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি নির্দিষ্ট সময়ের আবহাওয়ার গড় পরিবর্তনই জলবায়ু পরিবর্তন হলেও, এই পরিবর্তন যখন অস্বাভাবিক ও চরম পর্যায়ে পৌঁছায় তখন তা জলবায়ু বিপর্যয়ে রূপ নেয়।

জলবায়ু বিপর্যয়ের পেছনে প্রাকৃতিক কারণ থাকলেও মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডই এর প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত। বিশেষ করে শিল্পায়নের ফলে জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার, বন উজাড়, বায়ু ও পানি দূষণ, জলাশয় ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং অবকাঠামো উন্নয়ন পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে।

বাংলাদেশে এর প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। International Organization for Migration (IOM)-এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২২ সালে দেশে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ জলবায়ুজনিত কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং এই সংখ্যা প্রতিবছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বাস্তুচ্যুতি মানুষের জীবনযাত্রা, নিরাপত্তা এবং বিশেষ করে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে। বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর মধ্যে অপুষ্টি, পানিবাহিত রোগ, মানসিক চাপ এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমিত প্রাপ্তি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধিও একটি বড় উদ্বেগের কারণ। NASA এবং World Meteorological Organization (WMO)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক শতকে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রায় ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে এবং প্রতি দশকে তা আরও বাড়ছে। এর ফলে তীব্র তাপপ্রবাহ, হিট স্ট্রোক, কিডনি ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং পূর্ব থেকেই অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া, হিমালয়ের হিমবাহ গলে যাওয়া, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘন ঘন বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও খরার মতো দুর্যোগ খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে এবং বিশুদ্ধ পানির সংকট তৈরি করছে। এর ফলে অপুষ্টি, পানিবাহিত ও সংক্রামক রোগের প্রকোপ বাড়ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে তরুণদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জলবায়ু বিপর্যয়ের প্রভাব সবচেয়ে বেশি ভোগ করতে হবে বর্তমান তরুণ প্রজন্মকেই। তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক জীবনমান এই সংকটের কারণে ঝুঁকির মুখে পড়ছে। একই সঙ্গে বাস্তুচ্যুতি, বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমের মতো সামাজিক সমস্যার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে তরুণরাই এই সংকট মোকাবেলায় সবচেয়ে কার্যকর পরিবর্তনকারী শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন-যেমন প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, টেকসই খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা, জ্বালানি সাশ্রয়ী আচরণ অনুসরণ-ব্যক্তিগত পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি, সচেতনতা বৃদ্ধি, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক উদ্যোগে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তরুণরা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি। ২০১০ সালের Bangladesh Climate Change Trust Act 2010 যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, অভিযোজন ও প্রশমন কার্যক্রম জোরদার করা সম্ভব। তবে এই আইনের কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন নীতি নির্ধারকদের সদিচ্ছা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয় যে, জলবায়ু বিপর্যয় এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়-এটি বর্তমানের বাস্তবতা। এই সংকট মোকাবেলায় সরকার, বেসরকারি সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। একটি বাসযোগ্য, নিরাপদ ও সুস্থ পৃথিবী গড়ে তুলতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তরুণদের নেতৃত্বে সম্মিলিত উদ্যোগই পারে জলবায়ু বিপর্যয়ের প্রভাব মোকাবিলা করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই পৃথিবী নিশ্চিত করতে।

Share This News