নির্বাচনের আগে ভারতীয় সীমান্ত থেকে আসছে তিন নতুন মারাত্মক মাদক

সামনে নির্বাচন, আর ঠিক এই সময়েই মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ হাতেনাতে ধরেছে এক ভয়ংকর হুমকি: ভারতের সীমান্তবর্তী ১০টি জেলার অন্তত ৬২টি কারখানায় তৈরি হচ্ছে তিনটি অত্যন্ত নেশাজনক তরল মাদক, যা পাচার হয়ে আসছে বাংলাদেশে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা শাখা শনাক্ত করেছে এই পদার্থগুলোকে — ‘ব্রনোকফ সি’, ‘চকো প্লাস’ এবং ‘উইন কোরেক্স’। এগুলো মূলত কাশির সিরাপ, যা ইতোমধ্যে ভারতেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে নেশাজাতীয় উপাদানের কারণে। কর্মকর্তারা বলছেন, এই মাদকগুলো ফেনসিডিল আর ইয়াবার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক হতে পারে, যা বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে ধ্বংস করে আসছে।

নতুন প্রজন্মের নেশা

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বগুড়া কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান বলেন, “নতুন তিনটি মাদক দেশের মধ্যে ঢুকছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনী যদি সীমান্তেই এগুলো ঠেকাতে পারে, তাহলে দেশে এসব মাদক নিয়ন্ত্রণ অনেক সহজ হবে।”

এই সিরাপগুলো ভারতের ল্যাবোরেট ফার্মাসিউটিক্যালস নামের প্রতিষ্ঠান কাশির ওষুধ হিসেবে তৈরি করে, তবে এতে থাকে কোডিন ফসফেট মিশ্রিত অন্যান্য নেশাজাতীয় উপাদান। ঠান্ডার ওষুধ হিসেবে বাজারজাত করা হলেও, এগুলো পরিণত হচ্ছে শক্তিশালী মাদকে — আর যা একটি প্রেক্ষাপটে বৈধ, অন্যটিতে তা মারাত্মক।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে জানা যায়, ৩৭৪ জন ভারতীয় মাদক কারবারি সক্রিয়ভাবে কাজ করছে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা, নদীয়া, মালদা, মুর্শিদাবাদ, সিপাহীজলা, বিলোনিয়া, ত্রিপুরার পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চল, শান্তিরবাজার এবং মেঘালয়ের কারখানা কেন্দ্র থেকে। এসব মাদক ঢুকছে সাতক্ষীরা, যশোর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত দিয়ে।

জিরো টলারেন্স, কিন্তু উদ্বেগ বাড়ছে

বিজিবি ৫৩ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মোস্তাফিজুর রহমান জোর দিয়ে বলেন, “মাদক চোরাচালানের বিরুদ্ধে বিজিবি জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। নতুন মাদক নিয়েও আমরা সতর্ক আছি এবং মাদক প্রতিরোধে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।”

তবে স্থানীয় পুলিশ স্বীকার করছে যে তারা এখনো তথ্য সংগ্রহ করছে। রাজশাহী জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শরিফুল ইসলাম বলেন, “নতুন মাদক সম্পর্কে এখনো আমরা কোনো তথ্য পাইনি। তবে যে নামেই হোক, মাদক চোরাচালান প্রতিরোধে পুলিশ টহল আগের তুলনায় বাড়িয়েছে।”

সময়টা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। মাদক কর্মকর্তারা সতর্ক করছেন যে অপরাধী চক্রগুলো নির্বাচনের আগে নতুন মাদক দিয়ে বাজার সয়লাব করার প্রচেষ্টা তীব্র করছে — আগের রাজনৈতিক মৌসুমগুলোতেও এই ধরন দেখা গেছে।

ফেনসিডিল থেকে আরও ভয়ংকর কিছুতে

বাংলাদেশ আগেও মাদকের মহামারীর সঙ্গে লড়াই করেছে। একসময় ভারতীয় ফেনসিডিল দখল করেছিল অবৈধ বাজার, পরে তার জায়গা নিয়েছে ইয়াবা। এখন কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করছে যে এই নতুন তরল মাদকগুলো আরও বিপজ্জনক বিবর্তনের প্রতিনিধিত্ব করছে — পরিবহন সহজ, শনাক্ত করা কঠিন, এবং সম্ভবত আরও বেশি আসক্তিজনক।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক করে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কি যথেষ্ট দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারবে যাতে এই পদার্থগুলো ফেনসিডিল এবং ইয়াবার মতো দৃঢ় অবস্থান না নিতে পারে।

৬২টি কারখানা চালু এবং শত শত পাচারকারী সক্রিয় — এটা কোনো ছোটখাটো অপারেশন নয়। এটি একটি সংগঠিত পাইপলাইন যা লক্ষ্য করছে বাংলাদেশের তরুণদের — এবং এটি ইতোমধ্যে সক্রিয়।

Share This News