গাজীপুর — পরিবেশ সুরক্ষা আইনের সাথে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে, ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের সংরক্ষিত সীমানার ভেতরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণ শুরু করেছে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন (জিসিসি)। বন বিভাগ এবং পরিবেশবাদীদের তীব্র আপত্তি থাকা সত্ত্বেও, বর্তমানে উদ্যানের মূল প্রবেশপথে এক্সক্যাভেটর ও শ্রমিক দিয়ে এই নির্মাণকাজ চলছে।
জিসিসি’র সাইট সুপারভাইজারদের দাবি, তারা বন বিভাগের জায়গায় নয় বরং ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমিতে এই এসটিএস নির্মাণ করছেন। তবে পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং বন অধিদপ্তরের মতে, এই নির্মাণকাজ দেশের একাধিক জাতীয় সংরক্ষণ আইন ও পরিবেশগত বিধিমালার সরাসরি লঙ্ঘন।
আইনি কাঠামো: কীভাবে এই নির্মাণকাজ আইন লঙ্ঘন করছে
ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান রক্ষার আইনি নির্দেশিকাগুলো পর্যালোচনা করলে জিসিসি-র বেশ কয়েকটি সুস্পষ্ট আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যায়:
- বন্য প্রাণী (নিরাপত্তা ও সংরক্ষণ) আইন: এই গুরুত্বপূর্ণ আইন অনুযায়ী, ঘোষিত কোনো জাতীয় উদ্যানের ভেতরে ময়লা-আবর্জনা ফেলা বা স্তূপ করে রাখা সম্পূর্ণ বেআইনি। এসটিএস-এর মূল কাজই হলো বাসাবাড়ির বর্জ্য একত্র করা, যা সরাসরি এই আইনের পরিপন্থী।
- বন আইন, ১৯২৭ (২০ ধারা): এই ঐতিহাসিক আইনের ২০ ধারায় ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানকে একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই আইনে বন বিভাগের পূর্বানুমতি ছাড়া প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষেধ। তদুপরি, আইনি কাঠামো অনুযায়ী উদ্যানের সীমানা থেকে দুই কিলোমিটারের মধ্যে কোনো শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা ইটভাটা স্থাপন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন (৬ ডিসেম্বর ২০০৯): জিসিসি জমির মালিকানার যে যুক্তি দিচ্ছে, তা ২০০৯ সালের সরকারি প্রজ্ঞাপন দ্বারা অকার্যকর। ওই প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, উদ্যানের চৌহদ্দির মধ্যে থাকা ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে কৃষিকাজ ছাড়া অন্য কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না।
- পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা (ছাড়পত্র বাধ্যবাধকতা): পরিবেশ অধিদপ্তরের গাজীপুর কার্যালয়ের উপপরিচালক আরেফিন বাদলের মতে, আইন অনুযায়ী এসটিএস নির্মাণ করতে হলে পরিবেশগত ও অবস্থানগত ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক। জিসিসি এ ধরনের কোনো আইনি অনুমোদন ছাড়াই কাজ শুরু করেছে।
উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত বিপর্যয়
এই দ্বন্দ্ব ইতোমধ্যেই পার্কের ভৌত কাঠামোর ক্ষতি করেছে। বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের ঢাকা অঞ্চলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম কে এম ইকবাল হোছাইন চৌধুরীর মতে, জিসিসি-র কর্মীরা জোরপূর্বক উদ্যানের দেয়াল ভেঙে এই ময়লা ফেলার স্থাপনা নির্মাণ করছে। বন বিভাগের কর্মকর্তারা বাধা দিতে গেলে তারা শত শত লোক জড়ো করে কাজের পরিবেশ অস্থিতিশীল করে তোলে।
এর পরিবেশগত প্রভাব ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। ২০২৪ সালের শুরুতে জিসিসি উদ্যানের ৬ নম্বর প্রবেশপথে বর্জ্য ফেলতে শুরু করে। বন কর্মকর্তাদের মতে, এই বিষাক্ত বর্জ্যের সংস্পর্শে এসে শালবনের পাখি ও বানর অসুস্থ হয়ে পড়ছে এবং দুর্গন্ধে দর্শনার্থীদের জন্য অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এর আগে, ২০২৫ সালের ২৩ জানুয়ারি রাতে বাউপারা বিট এলাকায় বর্জ্য ফেলার সময় জিসিসি-র একটি ময়লার গাড়ি বন বিভাগ জব্দ করেছিল। পরে আদালতে আর বর্জ্য না ফেলার অঙ্গীকারনামা দিয়ে তারা গাড়িটি ছাড়িয়ে নেয়।
ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে বনাঞ্চল
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ৩,০০০ মেট্রিক টন বর্জ্য তৈরি হয়, যার মধ্যে তারা সংগ্রহ করতে পারে মাত্র ১,০০০ টনের মতো। বাকি বর্জ্য রাস্তাঘাটের আশেপাশে ফেলা হয়। তবে পরিবেশবাদীদের মতে, সংরক্ষিত বনভূমি ধ্বংস করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কোনোভাবেই আইনি বা টেকসই সমাধান হতে পারে না।
রিভার অ্যান্ড ডেলটা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি)-এর ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অপরিকল্পিত শিল্পায়নের কারণে গত দুই দশকে গাজীপুরে বনভূমি ও জলাশয় দুই-তৃতীয়াংশ কমেছে। ২০০০ সালে জেলায় বনভূমির পরিমাণ ছিল ৩৯,৯৪৩ হেক্টর, যা ২০২৩ সালে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৬,১৭৪ হেক্টরে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির স্পষ্ট জানিয়েছেন, বনের ভেতর এসটিএস নির্মাণ সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং জিসিসি-কে অবিলম্বে এই নির্মাণকাজ বন্ধ করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বৈধ বিকল্প খুঁজে বের করতে হবে।