ইইউর ৫ দেশের ‘রিটার্ন হাব’ পরিকল্পনা ও বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পাঁচটি দেশ—জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস ও গ্রিস—তাদের দেশে আশ্রয় আবেদন বাতিল হওয়া অভিবাসীদের ইইউর বাইরে তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে। প্রস্তাবিত এই কেন্দ্রগুলোকে বলা হচ্ছে ‘রিটার্ন হাব’। প্রাথমিক আলোচনা অনুযায়ী, কেনিয়া, উগান্ডা, ঘানা, রুয়ান্ডা ও উজবেকিস্তানের মতো দেশগুলোতে এই অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হতে পারে। গ্রিস এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে এবং আগামী বছর থেকেই এটি কার্যকর করতে চায় তারা।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও পরিসংখ্যান: ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের (ইইউএএ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইউরোপে আশ্রয় আবেদনকারীদের মধ্যে বাংলাদেশীরা চতুর্থ স্থানে রয়েছে (সিরিয়া, ভেনিজুয়েলা ও আফগানিস্তানের পরই)।

  • আবেদনের সংখ্যা: শুধু ২০২৫ সালেই ৩৬, ৯০১টি আবেদন জমা পড়েছে।
  • স্বীকৃতির হার: বাংলাদেশীদের আশ্রয় আবেদনের প্রথম ধাপের স্বীকৃতির হার অত্যন্ত কম—মাত্র ৩ শতাংশ
  • নতুন নিয়ম: নতুন ‘রিটার্ন রেগুলেশন’ অনুযায়ী, আবেদনগুলো মাত্র ১২ সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তি করা হবে এবং প্রত্যাখ্যাত হলে দ্রুত প্রত্যাবাসন বা রিটার্ন হাবে পাঠানো হবে।

বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হকের মতে, ইইউ আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো বাংলাদেশকে কিছু জানায়নি। সরকারের দাবি, দেশে বর্তমানে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত থাকায় রাজনৈতিক আশ্রয়ের কোনো যৌক্তিকতা নেই। সরকার অনিয়মিত অভিবাসন নিরুৎসাহিত করছে এবং দ্রুত আবেদন নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে।

বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে সমালোচনা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকগুলো

ইউরোপের দেশগুলো এটিকে “কার্যকর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া” বললেও, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ‘রিটার্ন হাব’ ধারণাটি অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং অমানবিক। নিচে এর মূল সমালোচনামূলক দিকগুলো তুলে ধরা হলো:

১. ‘নন-রিফাউলমেন্ট’ (Non-Refoulement) নীতির সরাসরি লঙ্ঘন

আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইন এবং ১৯ ৫১ সালের জেনেভা কনভেনশনের মূল ভিত্তি হলো ‘নন-রিফাউলমেন্ট’ নীতি। এই নীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে এমন কোনো দেশে জোরপূর্বক পাঠানো যাবে না, যেখানে তার জীবন, স্বাধীনতা বা মানবাধিকার হুমকির মুখে পড়তে পারে।

  • সমালোচনা: যেসব তৃতীয় দেশে (যেমন আফ্রিকান বা মধ্য এশিয়ার কিছু দেশ) এই হাবগুলো তৈরির পরিকল্পনা চলছে, তাদের অনেকেরই নিজস্ব মানবাধিকার ও আইনি সুরক্ষার রেকর্ড অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ। একজন আশ্রয়প্রার্থীকে তার নিজ দেশে না পাঠিয়ে সম্পূর্ণ অপরিচিত ও দুর্বল আইনি কাঠামোর তৃতীয় একটি দেশে পাঠানো এই নীতির স্পষ্ট লঙ্ঘন।

২. আইনি সুরক্ষার শূন্যতা ও বিচারিক প্রতিকার থেকে বঞ্চিত করা

ইউরোপের মাটিতে থাকলে একজন আশ্রয়প্রার্থী ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত (ECHR) এবং স্থানীয় আদালতের আইনি সুরক্ষা পান।

  • সমালোচনা: যখনই তাদের ইউরোপের সীমানা ছাড়িয়ে তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানো হবে, তখনই তারা এই আইনি সুরক্ষা বলয় থেকে ছিটকে পড়বেন। সেখানে তাদের আবেদন পুনর্মূল্যায়ন, আইনজীবী নিয়োগ বা অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার সুযোগ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। এটি মূলত “আইনি দায়িত্ব এড়ানোর কৌশল” (Legal Outsourcing)।

৩. অস্ট্রেলিয়ার ‘অফশোর প্রসেসিং’ মডেলের ব্যর্থতা ও অমানবিক ইতিহাস

অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী যথার্থই বলেছেন যে, এটি মানবতাবিরোধী। এর আগে অস্ট্রেলিয়া তাদের আশ্রয়প্রার্থীদের নাউরু (Nauru) এবং মানুস দ্বীপে (Manus Island) পাঠিয়েছিল।

  • বাস্তব অভিজ্ঞতা: গবেষণায় দেখা গেছে, বছরের পর বছর ওই বন্দিশিবিরগুলোতে অনিশ্চিত জীবন কাটানোর ফলে আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যে চরম মানসিক বৈকল্য, আত্মহত্যার প্রবণতা এবং স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতি ঘটেছিল। ইইউর এই ‘রিটার্ন হাব’ মূলত অস্ট্রেলিয়ার সেই ব্যর্থ ও অমানবিক মডেলেরই একটি নতুন রূপ।

৪. ধনী দেশগুলোর দ্বারা ‘সমস্যা পার্সেল’ করার উপনিবেশিক মানসিকতা

জার্মানি বা নেদারল্যান্ডসের মতো ধনী ও শক্তিশালী দেশগুলো তাদের অর্থনৈতিক অনুদান বা চুক্তির প্রলোভন দেখিয়ে কেনিয়া বা রুয়ান্ডার মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অভিবাসী রাখার ‘গুদামঘর’ হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।

  • মানুষ কোনো পণ্য নয় যে তাদের এক দেশ থেকে অন্য দেশে পার্সেল করে পাঠানো হবে। এটি মানবাধিকারের চরম অবমাননা এবং মানবিক সংকটকে অর্থের বিনিময়ে অন্য দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার শামিল।

৫. বাংলাদেশ সরকারের অবস্থানের বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণ

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ের প্রয়োজন নেই। এটি কূটনৈতিকভাবে সঠিক বক্তব্য হলেও, বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন।

  • মানুষ কেবল রাজনৈতিক কারণেই দেশ ছাড়ে না; অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার কারণেও অভিবাসনের ঘটনা ঘটে। মানবপাচারকারীরা এই দুর্বলতার সুযোগ নেয়। তাই শুধু “রাজনৈতিক আশ্রয়ের যৌক্তিকতা নেই” বলে দায় এড়ানো যায় না। ইউরোপে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের যেন কোনো অমানবিক তৃতীয় দেশের ক্যাম্পে পাঠানো না হয়, সে বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে আগাম ও জোরালো কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে।

ইউরোপের এই ‘রিটার্ন হাব’ পরিকল্পনা মূলত তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থী ও অভিবাসনবিরোধী ভোটারদের সন্তুষ্ট করার একটি চেষ্টা। কিন্তু মানবাধিকারের মানদণ্ডে, এটি একটি চরম পশ্চাদপসরণ। কোনো ব্যক্তির আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যাত হতেই পারে, কিন্তু তার প্রক্রিয়াকরণ ও প্রত্যাবাসন হতে হবে নিজ দেশের সাথে সরাসরি এবং মানবিক ও আইনি মর্যাদার সাথে—কোনো তৃতীয় দেশের অনিশ্চিত বন্দিশিবিরে ফেলে রেখে নয়।

Share This News