লেখক: কাজী মোহাম্মদ হাসিবুল হক, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ কর্মী
বাংলাদেশ সরকার তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ সংশোধন করে ই-সিগারেট (ভেপ), নিকোটিন পাউচসহ উদীয়মান তামাকজাত পণ্যের উৎপাদন, আমদানি, বিক্রি ও ব্যবহারের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এই সিদ্ধান্ত জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, তামাকবিরোধী সংগঠন ও সচেতন নাগরিকরা। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে ই-সিগারেট, ভেপ, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট এবং নিকোটিন পাউচকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। এতে এসব পণ্যের উৎপাদন, আমদানি, সংরক্ষণ, বিপণন ও ব্যবহারকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়।
কিন্তু সাম্প্রতিক খবর অনুসারে সরকার এখন সেই অধ্যাদেশ সংশোধন করে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পথে এগোচ্ছে। সংসদীয় বিশেষ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এই সংশোধনী নিয়ে কাজ চলছে। পাশাপাশি পয়েন্ট অব সেলে তামাকজাত পণ্য প্রদর্শনের নিষেধাজ্ঞাও তুলে নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। তামাকবিরোধী কর্মীরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে দেশের কোটি কোটি যুবক-যুবতী নেশার ফাঁদে পড়বে। ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচ বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দ্রুত আসক্তি তৈরি করে এবং পরবর্তীতে ঐতিহ্যবাহী সিগারেটের দিকে ঠেলে দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং অনেক দেশ এসব পণ্যকে ক্ষতিকর বলে চিহ্নিত করেছে।
নির্বাচনী ইশতেহারে সরকারি দল মাদক দমন, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা-পুনর্বাসন, যুব সমাজকে নেশা থেকে রক্ষা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছিল। সেখানে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং যুবকদের সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচের মতো নতুন আকর্ষণীয় নেশাজাত পণ্যের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার উদ্যোগকে অনেকে সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন। এতে সরকারি দলের প্রতি জনগণের আস্থা কমে যেতে পারে এবং তাদেরকে প্রতারক হিসেবে চিহ্নিত করার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক তামাক কোম্পানিগুলো নিকোটিন পাউচ উৎপাদনের অনুমতি পাওয়ার চেষ্টা করছে। এসব পণ্যকে ‘ধূমপানের কম ক্ষতিকর বিকল্প’ হিসেবে প্রচার করা হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এগুলো নতুন প্রজন্মকে নেশায় আকৃষ্ট করার ধূর্ত ফাঁদ। তামাকবিরোধী সংগঠনগুলো সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে যেন নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয় এবং যুব সমাজের স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
যদি ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয় তাহলে বাংলাদেশের যুবসমাজ ব্যাপকভাবে নেশায় আসক্ত হয়ে পড়তে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। সরকারের কাছে দাবি উঠেছে, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুসারে মাদক ও নেশার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রাখুন, জনগণের আস্থা ধরে রাখুন এবং যুব সমাজকে রক্ষা করুন।