গণভোট যেহেতু জনগণের সরাসরি মত প্রকাশের একটি সাংবিধানিক উপায়, তাই “হ্যাঁ” বা “না” উভয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার একমাত্র জনগণের। এই জায়গা থেকেই আমার মত হলো, গণভোটের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকা হওয়া উচিত সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। জনগণের করের টাকা ব্যবহার করে সরকার যদি একটি নির্দিষ্ট মতের পক্ষে, বিশেষ করে “হ্যাঁ” ভোটের জন্য প্রচারণা চালায়, তাহলে তা গণভোটের মৌলিক দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি হলো গণতন্ত্র, যার অর্থ জনগণের স্বাধীন মত প্রকাশ নিশ্চিত করা। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না যে সংবিধানে গণভোটের সময় সরকারি প্রচারণা নিষিদ্ধ করার কোনো সরাসরি ধারা রয়েছে কি না, তবে সংবিধানের সামগ্রিক চেতনা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শের পক্ষাবলম্বনকারী নয়, বরং সকল নাগরিকের প্রতিনিধি। সেই রাষ্ট্র যদি জনগণের অর্থ ব্যবহার করে একটি পক্ষকে এগিয়ে নেয়, তাহলে তা সাংবিধানিক নৈতিকতার প্রশ্ন তোলে।
গণভোটে সরকারের একপাক্ষিক প্রচারণা ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট করে। সরকারের হাতে প্রশাসনিক কাঠামো, সরকারি গণমাধ্যমে প্রবেশাধিকার ও বিপুল আর্থিক সামর্থ্য থাকে। এই শক্তি যদি একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের পক্ষে ব্যবহার করা হয়, তাহলে “হ্যাঁ” ও “না” ভোটের মধ্যে সমান সুযোগ আর থাকে না। আমার মতে, এতে জনগণের মতামত স্বাধীনভাবে গঠিত হওয়ার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকেও দেখা যায়, গণভোটের সময় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রায়ই বিতর্ক তৈরি হয়। যুক্তরাজ্য বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সরকার অনেক সময় নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করলেও রাষ্ট্রীয় অর্থ দিয়ে একপাক্ষিক প্রচারণা চালানোর বিষয়টি গণভোটের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না যে সব দেশেই একই নিয়ম অনুসরণ করা হয়, তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, সরকার যত বেশি প্রভাব বিস্তার করে, গণভোট তত বেশি বিতর্কিত হয়ে ওঠে।
সব মিলিয়ে আমার অবস্থান হলো, গণভোটে সরকার আয়োজনকারী ও তথ্য প্রদানকারীর ভূমিকায় থাকবে, কিন্তু সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে না। জনগণের টাকায় জনগণের মত প্রভাবিত করা গণতন্ত্রের শক্তি নয়, বরং দুর্বলতা প্রকাশ করে। গণভোট তখনই অর্থবহ হয়, যখন জনগণ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে, কোনো রাষ্ট্রীয় প্রভাব ছাড়াই “হ্যাঁ” বা “না” বলার সুযোগ পায়।
মতামত: কাজী মোহাম্মদ হাসিবুল হক।