নগর ও প্রকৃতি বাঁচাতে জলাশয় অপরিহার্য: পুকুর-লেক সংরক্ষণে চাই সমন্বিত উদ্যোগ

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, দ্রুত নগরায়ণ এবং নির্বিচার ভূমি ভরাটের কারণে সারা দেশেই আশঙ্কাজনক হারে কমছে প্রাকৃতিক জলাশয়। অথচ বাংলাদেশের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখা এবং নাগরিক জীবনের সুস্থতার জন্য পুকুর, দিঘি ও লেক অন্যতম প্রধান রক্ষাকবচ। পরিবেশবিদ ও নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি টেকসই ও স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে দেশের প্রতিটি নগর ও গ্রামে উন্মুক্ত জলাশয় সংরক্ষণ এখন জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া জরুরি।

জলাশয়ের বহুমুখী উপকারিতা ও গুরুত্ব

১. ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনর্ভরণ (Groundwater Recharge):

বৃষ্টির পানি প্রাকৃতিক উপায়ে মাটির নিচে পৌঁছাতে পুকুর ও লেক স্পঞ্জের মতো কাজ করে। দেশে বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। উন্মুক্ত জলাশয় মাটির আর্দ্রতা ধরে রেখে পানির স্তর স্বাভাবিক রাখতে ভূমিকা রাখে।

২. জলাবদ্ধতা নিরসন ও প্রাকৃতিক পানি ধারণক্ষমতা:

বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টির পানি ধারণ করার সবচেয়ে বড় আধার হলো লেক ও পুকুর। প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার সাথে লেকগুলো যুক্ত থাকলে শহরে তাৎক্ষণিক বন্যা ও দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে না।

৩. নগর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ (Microclimate Regulation):

ঘনবসতিপূর্ণ কংক্রিটের শহরে তাপমাত্রা বৃদ্ধি বা ‘হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট’ নিয়ন্ত্রণে জলাশয় অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। লেক ও পুকুরের পানি বাষ্পীভবনের মাধ্যমে চারপাশের বাতাস শীতল রাখে এবং তীব্র তাপদাহের সময় স্থানীয় জলবায়ুকে সহনশীল রাখে।

৪. অগ্নিনির্বাপণে জরুরি পানির উৎস:

ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা কিংবা শিল্পাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্যোগে তাৎক্ষণিক পানির প্রধান ভরসা নিকটবর্তী পুকুর ও জলাশয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোর একাধিক বড় অগ্নিকাণ্ডে পানির অভাবে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল আশপাশের পুকুর ভরাট হয়ে যাওয়া।

৫. জনস্বাস্থ্য, মানসিক প্রশান্তি ও শারীরিক কর্মকাণ্ড:

পরিষ্কার জলাশয় নাগরিকদের মানসিক চাপ কমাতে এবং শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়ক। নিরাপদ লেক বা পুকুর প্রবীণ ও নারীদের নিয়মিত হাঁটাচলা এবং শিশু-কিশোরদের সাঁতার শেখার চমৎকার সুযোগ সৃষ্টি করে। এটি স্থূলতা ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখে।

৬. জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য:

পুকুর ও লেক শুধু মানুষের জন্যই নয়, দেশীয় মাছ, জলজ উদ্ভিদ, ব্যাঙ, ডাহুক, পানকৌড়িসহ নানা প্রজাতির জলচর পাখি ও অণুজীবের নিরাপদ আবাসস্থল। জলাশয় হারিয়ে গেলে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে পড়ে।

দেশে জলাশয়ের ভূমিকা: বাস্তব কিছু উদাহরণ

  • হাতিরঝিল ও ধানমন্ডি লেক (ঢাকা):রাজধানীর হাতিরঝিল বৃষ্টির অতিরিক্ত পানি ধারণ এবং কারওয়ান বাজার, পান্থপথ ও মগবাজার এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখে। একইভাবে ধানমন্ডি লেক ঘনবসতিপূর্ণ ধানমন্ডি ও আশপাশের এলাকার পরিবেশের ফুসফুস এবং নাগরিকদের প্রাতঃভ্রমণ ও বিশ্রামের প্রধান স্থান হিসেবে কাজ করছে।
  • ফয়েজ লেক ও আগ্রাবাদ দেবা (চট্টগ্রাম):পাহাড়ি ঢলের পানি ধরে রাখা, মাটির ক্ষয় রোধ এবং বন্দরনগরীর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষায় কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক এই জলাধারগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
  • ঐতিহাসিক দিঘি ও গ্রামীণ পুকুর:দিনাজপুরের রামসাগর, বাগেরহাটের খানজাহান আলী (রহ.) দিঘি এবং গ্রামবাংলার পারিবারিক পুকুরগুলো শতাব্দীকাল ধরে সেচ, মাছচাষ এবং দৈনন্দিন গৃহস্থালি কাজের মূল পানির উৎস হিসেবে সেবা দিয়ে আসছে। বর্তমানে খুলনাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে কমিউনিটি উদ্যোগে পুকুর পরিষ্কার করে সাঁতার ও হাঁটার পথ তৈরির মতো টেকসই মডেল গ্রহণ করা হচ্ছে।

বর্তমান সংকট ও করণীয়

প্রাকৃতিক জলাশয়ের অপরিসীম গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও সারাদেশে দখল, অবৈধ ভরাট এবং অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য ও প্লাস্টিক ফেলার কারণে বহু পুকুর ও লেক এখন মৃতপ্রায়। ‘প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০’ অনুযায়ী কোনো পুকুর বা জলাশয় ভরাট করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও আইনের যথাযথ প্রয়োগের ঘাটতি দৃশ্যমান।

বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ:

  • শহর ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিদ্যমান সকল পুকুর ও খাস জলাশয়ের ডিজিটাল জিআইএস (GIS) ম্যাপিং করে আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
  • জলাশয়ে সরাসরি গৃহস্থালি ও পয়োবর্জ্য ফেলা কঠোরভাবে বন্ধ করা এবং বর্জ্য শোধন নিশ্চিত করা।
  • ভরাট হয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী পুকুর ও দিঘি পুনঃখনন করে কমিউনিটি-ভিত্তিক রক্ষণাবেক্ষণের আওতায় আনা।
  • নতুন যেকোনো আবাসিক বা বাণিজ্যিক প্রকল্পে পর্যাপ্ত উন্মুক্ত জলাশয় রাখা বাধ্যতামূলক করা।
Share This News