সারাদেশের সড়ক পরিবহনে বিশৃঙ্খলা, ক্রমবর্ধমান দুর্ঘটনা ও যাত্রী নিরাপত্তার দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনে নতুন উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। গত রোববার সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সভাকক্ষে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সাংবাদিকদের সামনে বেশ কিছু পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞ মহল এবং সাধারণ যাত্রীরা — উভয়ই প্রশ্ন তুলছেন: এবারের ঘোষণা কি কেবল বৈঠকেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সত্যিকারের পরিবর্তন আসবে?
সরকারের নতুন পরিকল্পনা
মন্ত্রী জানান, সব ধরনের গণপরিবহনে জিপিএস ট্র্যাকার বসানো হবে, যাতে যানবাহনের গতিবিধি প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারিতে আনা সম্ভব হয়। প্রতিটি বাস কাউন্টার ও বাসে ডিজিটাল ডিসপ্লের মাধ্যমে নির্ধারিত ভাড়া প্রদর্শন করা হবে — যাতে যাত্রীরা ভাড়া সম্পর্কে সচেতন থাকেন এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের সুযোগ কমে। এই উদ্যোগের পাশাপাশি ভিজিল্যান্স টিম ও পুলিশ কন্ট্রোল রুমকে সক্রিয় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
অতীতের দর্পণে বর্তমান
তবে এই ঘোষণাগুলো শুনতে পরিচিত লাগছে — কারণ এগুলো আসলেই পরিচিত। প্রায় ছয় বছর আগে শুরু হওয়া বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রম আজও বাস্তবায়িত হয়নি। ২০২১ সালে চালু হওয়া ঢাকা নগর পরিবহন গত বছর বন্ধ হয়ে গেছে। ই-টিকেটিং পদ্ধতি চালু হয়েছিল ভাড়া নৈরাজ্য কমাতে — এখন সেটিও মানা হচ্ছে না। বাস স্টপেজ ও যাত্রী ছাউনি তৈরি হয়েছিল নির্দিষ্ট স্থানে যাত্রী ওঠানামার জন্য — কিন্তু বাস এখনো থামে রাস্তার মাঝখানে, এমনকি ফ্লাইওভারের উপরেও।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবহন সেক্টরে সমস্যা কেবল সিদ্ধান্তের অভাবে নয় — বাস্তবায়নের ব্যর্থতাই এই খাতের সবচেয়ে পুরনো ও গভীর সংকট।
মাঠের বাস্তবতা
ঢাকার রাস্তায় এখন চলছে সাড়ে তিন হাজারের বেশি বাস-মিনিবাস — এর মধ্যে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সঠিক সংখ্যা কারো কাছে নেই। সারাদেশে পাঁচ লাখেরও বেশি মেয়াদোত্তীর্ণ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন রাস্তায় চলাচল করছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তাঁর কথায়, “সরকার চাইলেই সড়কে ফিটনেসবিহীন গণপরিবহন বন্ধ করা সম্ভব।”
রাজধানীতে লক্ষাধিক ব্যাটারি রিকশা যানজট পরিস্থিতিকে প্রতিদিন আরও জটিল করে তুলছে। নগরবাসী আশা করেছিলেন নতুন সরকার এই রিকশা উচ্ছেদে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে — কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
উচ্ছেদ অভিযানের ঘোষণা
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) গত ২৩ মার্চ এক গণবিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, আজ ৩১ মার্চের মধ্যে সড়কের পাশে বা সড়ক দখল করে গড়ে ওঠা সব ধরনের দোকান, ওয়ার্কশপ ও অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নিতে হবে। আগামীকাল ১ এপ্রিল থেকে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হবে। এই ঘোষণা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় — সেটাই এখন দেখার বিষয়।
যাত্রীদের কথা
সাধারণ যাত্রীরা বলছেন, নতুন উদ্যোগগুলো সঠিকভাবে পরিচালিত হলে হয়তো কিছুটা আশার আলো দেখা যাবে। কিন্তু তাদের ক্লান্তি স্পষ্ট। একটি দেশের রাজধানীতে এত জরাজীর্ণ বাস চলতে পারে — এটাই অকল্পনীয়। তাদের দাবি একটাই: ঘোষণা নয়, কার্যকর পদক্ষেপ।
নগরবাসীর সেই পুরনো প্রশ্নটা আজও অনুত্তরিত — গণপরিবহনের নৈরাজ্য বন্ধ হয়ে শৃঙ্খলা ফিরবে কবে?