এটা কোনো সাধারণ সীমান্ত সংঘর্ষ নয়। এটা একটা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ — এবং এটা এমন দুটো দেশের মধ্যে হচ্ছে যারা একসময় একে অপরের সবচেয়ে কাছের মিত্র ছিল।
শুরুটা কীভাবে হলো?
গত ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তানে একের পর এক ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হয়। ইসলামাবাদের একটি শিয়া মসজিদে আত্মঘাতী হামলায় ৪০ জনের বেশি নিহত হন। পাকিস্তান বরাবরের মতোই এর পেছনে আফগানিস্তান-ভিত্তিক তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা TTP-কে দায়ী করল। ১১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী সরাসরি হুঁশিয়ারি দেন — রমজানের আগে যদি আফগানিস্তান এই জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়, পাকিস্তান নিজেই সেখানে অভিযান চালাবে।
তালেবান কানে তুললো না।
তখন ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে পাকিস্তানি বিমান বাহিনী নানগারহার, পাক্তিকা এবং খোস্ত প্রদেশে বিমান হামলা চালায়, দাবি করে সেখানে TTP এবং ISIS-K-এর ৭টি জঙ্গি ঘাঁটি ছিল।তালেবান বলল এটা মিথ্যা — বোমা পড়েছে বেসামরিক মানুষের বাড়িতে, মাদ্রাসায়। জাতিসংঘ নিশ্চিত করে, ১৩ জনের বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
আফগানিস্তান প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিল।
তারপর কী হলো?
বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে আফগান বাহিনী পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া অঞ্চলের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে রকেট ও মর্টার ছুড়তে শুরু করে।পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী মানুষদের রাতের ঘুম ভেঙে পালাতে হলো। স্থানীয় এক বাসিন্দা দিলবার খান আফ্রিদি NBC News-কে বললেন, “মাঝরাতে আমাদের বাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়েছে।
পাকিস্তান সেটার জবাব দিলো ভোরবেলা। কাবুল, কান্দাহার, পাক্তিয়ায় বোমা পড়তে শুরু করল। তালেবান মুখপাত্র বললেন, হামলা হয়েছে নিরীহ নাগরিকদের বাড়িতে, শিশুদের মাদ্রাসায়।
এরপরই পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ সামাজিক মাধ্যমে লিখলেন — “আমাদের ধৈর্যের পাত্র উপচে গেছে। এখন আমাদের মধ্যে উন্মুক্ত যুদ্ধ।”
হতাহতের দাবি — কার কথা বিশ্বাস করবেন?
সরাসরি উত্তর হলো — কাউকে পুরোপুরি নয়। যুদ্ধের মাঠের তথ্য সবসময়ই বিতর্কিত।
পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্র দাবি করেছেন ২৭৪ জন আফগান যোদ্ধা নিহত এবং ৪০০ জনের বেশি আহত। তালেবান মুখপাত্র বললেন, নিহত মাত্র ১৩ জন আফগান।অন্যদিকে তালেবান দাবি করছে ৫৫ জন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত, কয়েকজনকে বন্দী করা হয়েছে এবং ১৯টি পাকিস্তানি সামরিক চৌকি ধ্বংস করা হয়েছে। পাকিস্তান স্বীকার করছে মাত্র ১২ জন নিহতের কথা।
স্বীকার করেছে, দুর্গম অঞ্চলে যুদ্ধ হওয়ায় কোনো দাবিই স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আসল ছবিটা কী?
এই যুদ্ধের মূলে একটাই প্রশ্ন — TTP কি সত্যিই আফগানিস্তান থেকে পরিচালিত হচ্ছে?
২০২১ সালে আমেরিকার চলে যাওয়ার পর থেকে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। পাকিস্তান বলছে, হামলাকারীরা আফগানিস্তানকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে।তালেবান এই অভিযোগ বারবার অস্বীকার করেছে।
বিশেষজ্ঞ এলিজাবেথ থ্রেলকেল্ড বলছেন, এই সংঘর্ষ আচমকা নয় — মাসের পর মাস ধরে সম্পর্কের অবনতি হচ্ছিল। পাকিস্তান এখন কৌশল বদলেছে — শুধু সীমান্তে নয়, সরাসরি আফগান শহরগুলোতে হামলা করছে।
একটা তিক্ত সত্য এখানে আছে। পাকিস্তান নিজেই আফগান তালেবানকে বড় করেছিল। এখন সেই তালেবান পাকিস্তানকে শত্রু বানিয়ে বসেছে — একজন বিশেষজ্ঞ একে বলছেন “নিজের পোষা পাখির ঠোঁট নিজের চোখে বিঁধে যাওয়া।
বাকি দুনিয়া কী বলছে?
জাতিসংঘ এবং রাশিয়া তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। চীন “গভীর উদ্বেগ” প্রকাশ করেছে। ভারত আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্বের পক্ষে কথা বলেছে — যেটা স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তানকে বিরক্ত করবে। ইরান রমজান মাসে শান্তির আহ্বান জানিয়েছে। কাতার ও তুরস্ক আলোচনার টেবিল সাজানোর চেষ্টা করছে। আমেরিকা পাকিস্তানের “আত্মরক্ষার অধিকার” সমর্থন করেছে।
এরপর কী হবে?
বিশেষজ্ঞ আব্দুল বাসিত বলেছেন, “আমার মনে হয় ২০২৬ সালে গ্রীষ্ম আগেভাগেই এসে গেছে — এবং এটা একটা রক্তাক্ত গ্রীষ্ম হতে চলেছে। তিনি আরও বললেন, তালেবানের কাছে গতানুগতিক বিমান বাহিনী নেই, তাই তারা ড্রোন, আত্মঘাতী হামলা এবং গেরিলা কৌশলে পাকিস্তানের শহরগুলোতে আঘাত হানার পথে যেতে পারে।
পাকিস্তান একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। কিন্তু তালেবান সেই দল যারা আমেরিকাকে ২০ বছরে হারিয়ে দিয়েছে। এই সংঘর্ষের কোনো সহজ পরিণতি নেই।
এবং মাঝখানে পিষে যাচ্ছে সাধারণ মানুষ — দুই দেশের।
তথ্যসূত্র: CNN, NPR, Al Jazeera