এটি ছিল একটি সাধারণ সমুদ্রযাত্রা হওয়ার কথা—মিশরের পোর্ট সুয়েজ থেকে খালি তেলবাহী জাহাজ নিয়ে রাশিয়ার নভোরোসিস্ক বন্দরে ক্রুড অয়েল ভরতে যাওয়া। কিন্তু ২৭৫ মিটার দীর্ঘ ‘এমটি কায়রোস’ জাহাজের ২৫ নাবিকের জন্য, যাদের মধ্যে চারজন বাংলাদেশি, শুক্রবার বিকেলটি পরিণত হয় এক দুঃস্বপ্নে—যার ঘোর এখনো কাটেনি তাদের।
তুরস্কের উপকূল থেকে প্রায় ২৮ নটিক্যাল মাইল দূরে কৃষ্ণসাগরে স্থানীয় সময় বিকেল পৌনে ৫টার দিকে ইউক্রেইনের নৌ-ড্রোন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয় জাহাজটি। এরপর দুই ঘণ্টা ছিল বিশৃঙ্খলার—মিসাইল, আগুন, বিস্ফোরণ এবং বেঁচে থাকার মরিয়া লড়াই।
“যখন প্রথম মিসাইল প্রপেলারে আঘাত করল, আমরা বুঝে গেলাম যে কিছু একটা মারাত্মক ঘটতে যাচ্ছে,” স্মৃতিচারণ করেন জাহাজের চতুর্থ প্রকৌশলী মাহফুজুল ইসলাম, যিনি এখন তুরস্কের ইজমিত শহর থেকে কথা বলছেন যেখানে উদ্ধার হওয়া নাবিকরা অবস্থান করছেন। “তারপর ১০ মিনিট পরেই আরেকটি মিসাইল ইঞ্জিন রুমের ফুয়েল ট্যাংকে আঘাত করল। বিস্ফোরণটা… আগুনটা… মনে হচ্ছিল সব শেষ হয়ে যাচ্ছে।”
চার বাংলাদেশি নাবিক—চতুর্থ প্রকৌশলী মাহফুজুল ইসলাম, অয়েলার হাবিবুর রহমান, পাম্প ম্যান আসগর হোসাইন এবং ডেক ক্যাডেট আল আমিন হোসেন—ভাগ্যবানদের মধ্যে ছিলেন। তুরস্কের কোস্ট গার্ড টিম সব ২৫ জন নাবিককে উদ্ধার করে, যাদের মধ্যে ১৯ জন চীনা নাগরিক এবং মিয়ানমার ও ইন্দোনেশিয়া থেকে একজন করে ছিলেন।
সমুদ্রে আসলে কী ঘটেছিল
ইউক্রেনের নিরাপত্তা সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, রাশিয়ার তথাকথিত “ছায়া বহর”—যেসব জাহাজ মস্কোকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে রাশিয়ান তেল পরিবহনে সহায়তা করে বলে অভিযোগ—তাদের লক্ষ্য করে এই অভিযান চালানো হয়। গাম্বিয়ার পতাকাবাহী কায়রোসকে এই বছরের জুলাই মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। একই অভিযানে আরেকটি ট্যাঙ্কার ‘ভিরাত’ও আক্রান্ত হয়।
কিন্তু নরসিংদীর ২৫ বছর বয়সী মাহফুজের জন্য, বাংলাদেশ নেভাল অ্যাকাডেমির ৫৫ ব্যাচের শিক্ষার্থী এই তরুণ প্রকৌশলীর কাছে, সেই ভয়াবহ মুহূর্তে রাজনীতি বা ভূ-রাজনীতির কোনো মানে ছিল না। “আমরা শুধু আমাদের কাজ করছিলাম,” তিনি মৃদু স্বরে বলেন। “আমি শুধু দেশে আমার পরিবারের কথা ভাবছিলাম।”
ঘটনার পর
উদ্ধার হওয়ার পর স্থানীয় একটি হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় নাবিকদের। শারীরিকভাবে সবাই সুস্থ থাকলেও মানসিক আঘাত রয়েই গেছে—এ কথা স্বীকার করেন মাহফুজুল।
“আমরা সবাই এখনো ঘটনাটা মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছি। সেই বিস্ফোরণের শব্দ, জাহাজ জ্বলতে দেখা… এগুলো এমন কিছু যা সহজে ভোলা যায় না,” তিনি জানান। “তুরস্কের কোস্ট গার্ডের সদস্যরা—তারা যেন ঠিক সময়ে ত্রাতা হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন।”
নাবিকরা তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছেন, যদিও মাহফুজুল উল্লেখ করেন যে তারা এখনো তুরস্কে বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। “আমাদের সাথে পাসপোর্ট আছে, তাই কোনো বড় সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবে প্রয়োজন হলে যোগাযোগ করব,” তিনি যোগ করেন।
বিপজ্জনক এলাকা
ইউক্রেইন যুদ্ধ চলাকালীন রাশিয়ান জাহাজের বিরুদ্ধে একাধিক সফল নৌ হামলা চালিয়েছে, বিশেষ করে বিস্ফোরক-ভর্তি নৌ-ড্রোন ব্যবহার করে। তবে তুরস্কের জলসীমায় এই হামলা একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যা অঞ্চলে নৌ-চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাখাওয়াত হোসেন নিশ্চিত করেছেন যে সংগঠনটি পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। “আমরা আমাদের নাবিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। তাদের উদ্ধার করা হয়েছে এবং চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
বাংলাদেশে পরিবারগুলোর জন্য স্বস্তির বিষয় যে তাদের প্রিয়জনরা বেঁচে আছেন, যা সহজেই একটি ট্র্যাজেডি হতে পারত। কিন্তু নাবিকদের জন্য, এই অভিজ্ঞতা রেখে গেছে এক অমোচনীয় দাগ।
“আপনি ডেকে দাঁড়িয়ে আছেন, মিসাইল আপনার দিকে আসছে দেখছেন, আর তখন বুঝতে পারছেন সবকিছু কত ভঙ্গুর,” ভাবনায় ডুবে যান মাহফুজুল। “আমরা বেঁচে থাকার জন্য কৃতজ্ঞ। কিন্তু এই ধাক্কা—সেটা কাটতে সময় লাগবে।”
এমটি কায়রোস এখনো কৃষ্ণসাগরে পরিত্যক্ত অবস্থায় জ্বলছে, যা রাশিয়া-ইউক্রেইন সংঘাত কীভাবে আন্তর্জাতিক জলসীমায় ছড়িয়ে পড়ছে তার এক নির্মম স্মারক—যা প্রভাবিত করছে নিরপরাধ নাবিকদের যারা শুধু দেশ থেকে দূরে জীবিকা অর্জনের চেষ্টা করছিলেন।