ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে সড়কে হতাহতদের স্মরণে বৈশ্বিক দিবস পালিত

১৬ নভেম্বর ২০২৫, ঢাকা : ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) এর উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি সংস্থার অংশগ্রহণে সড়কে হতাহতদের স্মরণে বৈশ্বিক দিবস ‘ওয়ার্ল্ড ডে অফ রিমেমব্রান্স ফর রোড ট্রাফিক ভিকটিমস’ উদযাপিত হয়। এ উপলক্ষে ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিস ইনিশিয়েটিভ ফর গ্লোবাল রোড সেফটি (বিআইজিআরএস) ও ভাইটাল স্ট্রাটেজিস এর কারিগরি সহায়তায় ১৬ নভেম্বর ২০২৫, বিকালে নগর ভবনের সম্মেলন কক্ষে গোলটেবিল সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিআইজিআরএস এর ইনিশিয়েটিভ কোঅর্ডিনেটর ও অতিরিক্ত সচিব (অব.) মো. আবদুল ওয়াদুদ এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অতিথি হিসাবে বক্তব্য রাখেন ডিএনসিসি’র প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেঃ জেনাঃ মোঃ মঈন উদ্দিন, এসইউপি, এসপিপি, এনডিসি, পিএসসি। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ভাইটাল স্ট্রাটেজিস এর কারিগরি পরামর্শক আমিনুল ইসলাম সুজন।

সম্মানিত অতিথি প্রধান প্রকৌশলী ব্রি.জে. মো. মঈন উদ্দিন বলেন, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান আইন ও বিধি’র যথাযথ বাস্তবায়ন করাই আমাদের মূল চ্যালেঞ্জ। এগুলো বাস্তবায়নের জন্য সব পক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন। পরিবহন মালিক-চালক, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা, বিআরটিএ, সড়কের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান, সর্বোপরি সড়ক ব্যবহারকারী প্রত্যেকের দায়িত্ব এগুলো মেনে চলা। ডিএনসিসি ফুটপাথ, জেব্রাক্রসিং, রোড মার্কিং, ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণসহ যা যা করা দরকার সেগুলো করার চেষ্টা করছি।

সভা সঞ্চালক বিআইজিআরএস এর ইনিশিয়েটিভ কোঅর্ডিনেটর মো. আবদুল ওয়াদুদ দিবসটির গুরুত্ব ও প্রতিপাদ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রোডক্র্যাশে হতাহতদের স্মরণ করার মধ্য দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন ক্র্যাশ প্রতিরোধ করা যায়, তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই দিবসটি পালন করা হয়। বিশ্বজুড়ে ৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর প্রধান কারণই রোডক্র্যাশ। এজন্য এবছর দিবসটির প্রতিপাদ্য করা হয়েছে ‘বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর সড়কে ঝরছে ১০ লাখের বেশি প্রতিভার প্রাণ।’

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনে ভাইটাল স্ট্রাটেজিস এর কারিগরি পরামর্শক আমিনুল ইসলাম সুজন বলেন, এ বছরের দিবসটির প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘প্রতিভার মৃত্যু’ (lost talents)। রোড ক্র্যাশে শুধু সড়কে মানুষ মারা যায় না, তাদের সঙ্গে মেধা, আইডিয়া ও সমাজে তাদের সম্ভাব্য প্রতিফলন -সেটারও বিনাশ ঘটে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, রোড ক্র্যাশে মারা যায় বেশি অল্পবয়সী, তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, যারা পরিবার ও সমাজে অনেকদিন ভূমিকা রাখতে পারত। কিন্তু সড়কে অকালমৃত্যুর কারণে তাদের সম্ভাব্য অবদান থেকে শুধু সংশ্লিষ্ট পরিবারই বঞ্চিত হয় না, একইসঙ্গে সমাজ ও রাষ্ট্র সম্ভাব্য সৃজনশীলতা ও উৎপাদনশীলতা থেকে বঞ্চিত হয়।

ডিএনসিসি’র তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খন্দকার মাহবুব আলম বলেন, রোডক্র্যাশে হতাহতদের স্মরণ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন এমন পরিস্থিতিতে কাউকে পড়তে না হয়, সেটা নিশ্চিতে ডিএনসিসি বদ্ধ পরিকর। তিনি সড়কে স্বজন হারানো সকল পরিবারের প্রতি সহানুভূতি জ্ঞাপন করেন। এসময় তিনি আগামী দিনে ঢাকার সড়ককে আরো নিরাপদ করতে সকলের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন। ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি (ডিটিসিএ) এর সিনিয়র রোড সেফটি স্পেশালিস্ট মো. মামুনুর রহমান বলেন, সড়ক নিরাপত্তায় অনেক পক্ষের দায়িত্ব রয়েছে। মানসম্মত গাড়ি আমদানি বা তৈরি করা, মানসম্পন্ন সড়ক নির্মাণ, সড়কে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালক সবকিছুই জরুরি। পাশাপাশি সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতনতাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকায় মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে যাত্রী সাধারণের দুর্ভোগ কমাতে ডিটিসিএ কাজ করছে। যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতি হলে পথচারীদের সড়ক পারাপার ও যানবাহনের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত হবে।

রোডক্র্যাশে নিহত সন্তানের পিতা ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক এস এম সাইফুল ইসলাম বলেন, গত বছর ৯ অক্টোবর ঢাকার বাড্ডায় আমার মেয়ে বাস চাপায় প্রাণ হারিয়েছে। দ্রুতগামী একটি বাস অপর বাসকে ওভারটেক করতে গিয়ে আমার মেয়ের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। আমি চাই না এভাবে আর কোনো মায়ের কোল খালি হোক। এজন্য সড়কে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগের আহ্বান জানান তিনি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট প্রোস্কোভিয়া অকোয়া লায়েত বলেন, সড়কে কোন ক্র্যাশ হওয়ার পর দ্রুততার সঙ্গে আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অকালমৃত্যু ও পঙ্গুত্ব অনেক কমানো সম্ভব। এছাড়া রোড ক্র্যাশ পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় মানুষের সচেতনতা জরুরি বলে তিনি মনে করেন। ব্র্যাক-এর রোড সেফটি প্রকল্পের প্রধান ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব খালিদ মাহমুদ বলেন, এদিনটি শুধু সড়কে হতাহতদের স্মরণ করার জন্য নয়, বরং ভবিষ্যতে যেন এমন পরিণতি কারো না হয় সেটা নিশ্চিত করতে আমাদের অঙ্গীকার নেওয়ারও দিন আজ। আমি সড়ক নিরাপত্তায় কর্মরত সব সংস্থা ও সংগঠনকে এলক্ষ্যে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি।

বিআরটিএ’র উপ-পরিচালক সুবীর কুমার সাহা বলেন, সড়ককে নিরাপদ করতে বিআরটিএ নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। সম্প্রতি বিআরটিএ নতুন লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে চালকদের জন্য ৬০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করেছে। অন্যদিকে রোডক্র্যাশে হতাহতদের জন্য বিআরটিএ’র পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা প্রদানের বিষয়টিও সহজ করতে কাজ চলছে।

নিরাপদ সড়ক চাই—নিসচার মহাসচিব এস এম আজাদ হোসেন বলেন, নিরাপদ সড়ক আমাদের অধিকার। উন্নত রাষ্ট্র হতে হলে সড়ককে অবশ্যই নিরাপদ করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, রোডক্র্যাশে শুধু একজন ব্যক্তির মৃত্যু হয় না, বরং তার পুরো পরিবারই বিপর্যয়ে পড়ে। যার আঘাত পড়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে। অনুষ্ঠানে আরো আলোচনা করেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উপ-সচিব আল-আমিন মো. নুরূল ইসলাম, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন—পবার সহ-সভাপতি ম. হাফিজুর রহমান ময়না, ওয়ার্ক ফর অ্যা বেটার বাংলাদেশ—ডব্লিউবিবি ট্রাস্টের পরিচালক গাউস পিয়ারী, আর্ক ফাউন্ডেশনের বদরুদ্দীন সাইফি, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের ওয়ালী নোমান প্রমুখ।

Share This News