ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো হাজারো মরদেহ—গাজার প্রকৃত মৃত্যুর হিসাব এখনো অজানা

গাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রতিদিন উঠে আসছে নতুন নতুন মরদেহ। উদ্ধারকর্মীরা যখন কংক্রিট আর লোহার স্তূপ সরিয়ে একের পর এক লাশ বের করছেন, তখন বোঝা যাচ্ছে এই যুদ্ধের প্রকৃত ভয়াবহতা আসলে কতটা গভীর।

জানুয়ারি ২০২৫-এ যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর মাত্র এক সপ্তাহেরও কম সময়ে প্রায় ২০০ মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে । কিন্তু এটা শুরু মাত্র। সিভিল ডিফেন্স কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুরো গাজা জুড়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের নিচে এখনো প্রায় ১০ হাজার মরদেহ চাপা পড়ে আছে ।

আরও ভয়ংকর তথ্য হলো—ইসরায়েলি হামলার তীব্রতায় প্রায় ২,৮৪০ মানুষ পুরোপুরি বাষ্পীভূত হয়ে গেছেন, কোনো চিহ্নই রয়ে যায়নি। তাদের পরিবার এমনকি শেষকৃত্যের জন্যও কিছু পাবে না।

ডিসেম্বর ২০২৪ মাঝামাঝি পর্যন্ত রিপোর্ট করা মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৪৫,০০০ ফিলিস্তিনি, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। তবে সাম্প্রতিক একটি একাডেমিক গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে প্রকৃত সংখ্যা ৭৮,৩১৮, যা ৭ অক্টোবর ২০২৩ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত হিসাব এই পার্থক্যই দেখায় চলমান ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে সঠিক হিসাব রাখা কতটা কঠিন।

উদ্ধার অভিযান চালাতে গিয়ে সামনে আসছে অসংখ্য চ্যালেঞ্জ। জাতিসংঘের একটি মূল্যায়ন অনুসারে ৫০ মিলিয়ন টনেরও বেশি ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করতে ২১ বছর সময় এবং ১.২ বিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারে । ফিলিস্তিনিদের প্রায়ই খালি হাতে, কোদাল আর শাবল দিয়ে খুঁড়তে হচ্ছে—ইসরায়েল ভারী যন্ত্রপাতি ধ্বংস করে দিয়েছে এবং ব্যবহার করতে দিচ্ছে না, ফলে উদ্ধারকর্মীদের কাছে সঠিক সরঞ্জাম নেই ।

আহমেদ সালিমের মতো পরিবারগুলোর জন্য এই অপেক্ষা অসহ্য যন্ত্রণাদায়ক। নিজের ধ্বংস হওয়া বাড়ির ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে সালিম তার ৩০ জনেরও বেশি পরিবারের সদস্যের মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা করছেন, যারা ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪-এ ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছিলেন । কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, “আমার শুধু চাই তাদের দাফন করতে পারি।”

আমাল আবদেল আল যুদ্ধের একেবারে শুরু থেকেই তার ছেলে আর ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধারের অপেক্ষায় আছেন। ৫৭ বছর বয়সী এই নারী বলেন, “তারা কখনো আমার মন থেকে যায় না। ভাবলেই বুকটা ফেটে যায় যে কুকুররা হয়তো তাদের মরদেহে পৌঁছে যাচ্ছে”।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে হামলায় ইসরায়েলে প্রায় ১,২০০ জন নিহত এবং প্রায় ২৫০ জনকে জিম্মি করা হয়। এর জবাবে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান গাজার বেশিরভাগ অংশকে পরিণত করেছে চেনা যায় না এমন ধ্বংসস্তূপে।

ধ্বংসাবশেষে রয়েছে অবিস্ফোরিত বোমা এবং ইসরায়েলি বুবি ট্র্যাপ, যা উদ্ধারকর্মী এবং ফিরে আসা বাসিন্দাদের জন্য প্রাণঘাতী হুমকি । অনেক মরদেহ এতটাই পচে গেছে যে চেনাই যায় না। পরিবারগুলো খুঁজে বেড়াচ্ছে কোনো চিহ্ন—একটুকরো কাপড়, একটা জুতা, যা দিয়ে তাদের প্রিয়জনকে শনাক্ত করা যায়।

সংখ্যা দিয়ে পুরো কাহিনী বলা যায় না। প্রতিটি পরিসংখ্যানের পেছনে আছে একটি বিধ্বস্ত পরিবার, একটি শিশু যে আর কখনো বাড়ি ফিরবে না, একজন বাবা-মা যিনি চাপা পড়ে আছেন কংক্রিটের নিচে। যারা বেঁচে আছেন তাদের মানসিক অবস্থা অকল্পনীয়। তারা এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তায় বাস করছেন—জানেন প্রিয়জন চলে গেছেন কিন্তু দাফনের মতো সাধারণ মানবিক কাজটুকুও করতে পারছেন না।

উদ্ধার কাজ চলতে থাকলেও একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে—গাজার এই ট্র্যাজেডির সম্পূর্ণ হিসাব হয়তো কখনোই জানা যাবে না। হাজার হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ, তাদের শেষ মুহূর্ত এবং সমাধিস্থল যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে হারিয়ে গেছে।

Share This News