খুলনা নগরকে ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জলবায়ু-সহনশীল নগর হিসেবে গড়ে তুলতে নগরবাসীর অংশগ্রহণ ও বহুমাত্রিক সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরে ‘ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক খুলনা নগরী নিশ্চিতে’ অভিজ্ঞতা বিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার খুলনা প্রেসক্লাবের ব্যাংকুয়েট হলে সিয়াম এবং ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টের যৌথ আয়োজনে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, খুলনা দেশের তৃতীয় বৃহত্তম নগর হলেও দ্রুত নগরায়ন, জলবায়ু বিপর্যয়, কর্মসংস্থানের সংকট, অসম ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন নগরটিকে নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের পর নগরটির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার ঘটলেও সামাজিক বৈষম্য ও মৌলিক সেবার ঘাটতি দূর হয়নি। বন্যা, লবণাক্ততা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো জলবায়ুজনিত দুর্যোগ এবং উপকূলীয় অঞ্চল থেকে অভিবাসীদের আগমন নগরের উপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। নিম্ন আয়ের মানুষ ও বস্তিবাসীদের জন্য নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্য সেবা ও পয়ঃনিষ্কাশনের মতো মৌলিক সুবিধা এখনো অধরা রয়ে গেছে, ফলে ন্যায্যতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।

সভায় বক্তারা উল্লেখ করেন, খুলনার দীর্ঘদিনের শিল্পোজ্জ্বল ইতিহাস আজ নানা কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে। ২০০২ সালে পাটকল ও টেক্সটাইল মিল বন্ধ হওয়ার পর থেকে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়ায় বিপুল মানুষ অনানুষ্ঠানিক কাজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অপরদিকে জলাশয় দখল, পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা ও দুর্বল নগর শাসনব্যবস্থা টেকসই নগর উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় নাগরিকদের অংশগ্রহণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি বলে বক্তারা মত প্রকাশ করেন। তারা বলেন, স্থানীয় জনগণ, বিশেষত নারী, শিশু, যুব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়, তখন নগরের উন্নয়ন আরও সুষম ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়।
সভায় ‘একটিভ সিটিজেন প্ল্যাটফর্ম’-এর কার্যক্রম বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট ও সোশ্যাল এন্ড এনভায়রনমেন্টাল ইনক্রিজিং এনালাইসিস মুভমেন্ট-এর সহযোগিতায় খুলনা সিটি কর্পোরেশনের ৩১টি ওয়ার্ডের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত এ প্ল্যাটফর্ম ইতোমধ্যেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমস্যা চিহ্নিতকরণ, নীতিনির্ধারণে নাগরিক মতামত প্রতিফলন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমতা অগ্রাধিকার এবং জলবায়ু-সহনশীল উদ্যোগ বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছে। প্ল্যাটফর্মটি সরকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করে খুলনা নগরকে আরও বাসযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েছে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, টেকসই নগর উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ওয়ার্ডভিত্তিক মতামত সংগ্রহ, নাগরিক তদারকি দল গঠন, স্বচ্ছতা বৃদ্ধির উদ্যোগ, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এবং স্থানীয় সমস্যার ভিত্তিতে নীতি প্রণয়ন সময়ের দাবি। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়। তারা জানান, নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণই খুলনা নগরকে ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর হিসেবে গড়ে তুলতে মূল ভূমিকা রাখবে।

অনুষ্ঠানটির সভাপতিত্ব করেন সাইফুদ্দিন আহমেদ, নির্বাহী পরিচালক, ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট; সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (শিক্ষা ও আইসিটি), দেব প্রসাদ পাল; প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার, আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহ (সিনিয়র সহকারী সচিব), খুলনা সিটি কর্পোরেশন; মো. সায়েদুর রহমান, জেলা শিক্ষা অফিসার, খুলনা; লিয়াকত হোসেন, প্রধান শিক্ষক, পিডব্লুউডি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং সাধারন সম্পাদক, হেড টিচার্স ফোরাম, খুলনা; অনুষ্ঠানটি সার্বিকভাবে পরিচালনা করেন এড.মাসুম বিল্লাহ; মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেনে, উম্মে জোয়ায়রা (নাবিলা), সহ-সমন্বয়ক, একটিভ সিটিজেন প্লাটফর্ম এবং সীমান্ত সাহা রাতুল, শিক্ষার্থী, খুলনা ইউনিভার্সিটি।
বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, নাগরিক-চাহিদানির্ভর উন্নয়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খুলনা একটি ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জলবায়ু-সহনশীল নগরীতে পরিণত হবে। তাদের মতে, ন্যায্য খুলনা কোনো কল্পনা নয়; বরং নাগরিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, সহযোগিতা ও সচেতনতার মাধ্যমে এটি অর্জনযোগ্য বাস্তবতা।