সম্প্রতি এক গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান দাবি করেছেন যে, তিনি আইন মেনে ফিলিপ মরিস বাংলাদেশ লিমিটেডকে নিকোটিন পাউচ উৎপাদনের অনুমোদন দিয়েছেন। আমরা এই বক্তব্যের তীব্রনিন্দা জানাই। আমরা মনে করি, এই বক্তব্য সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর, তথ্যভিত্তিহীন এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন। তাঁর এই মন্তব্য জনগণের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে এবং সরকারের জনস্বাস্থ্য রক্ষার নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
একজন রাষ্ট্রীয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে এ ধরনের মন্তব্য কোনোভাবেই সমীচীন নয়। নির্বাহী চেয়ারম্যান তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, “নিকোটিন পাউচ ক্ষতিকর কিনা—এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।” এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে, তিনি পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ যাচাই না করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অথচ, নিকোটিন পাউচের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সুস্পষ্ট সতর্কতা জারি করেছে—এটি অত্যন্ত আসক্তিকর, স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং কোনোভাবেই নিরাপদ নয়।

উল্লেখ্য, এই ধরনের পণ্য ক্ষতিকর কিনা তা নির্ধারণ করা বিডার দায়িত্ব নয়। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব রয়েছে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও বিএসটিআই–এর মতো সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু অনুমোদন প্রদানের সময় নির্বাহী চেয়ারম্যান সুকৌশলে এসব সংস্থাগুলোকে এড়িয়ে গেছেন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে উপেক্ষা করেছে, তাদের সাথে কোনো আলোচনায় যাননি—যা সরকারি প্রশাসনিক নীতি ও সমন্বয় কাঠামোর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
তিনি একজন দায়িত্বশীল পদে থেকে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—মানুষমাত্রই ভুল হতে পারে। তিনি তাঁর ভুল স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারতেন এবং জনস্বার্থে এই অনুমোদন বাতিল করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে আবারো বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়ে জনগণের মনে প্রশ্ন তুলেছেন—কেন তিনি একটি স্বীকৃত ক্ষতিকর পণ্য উৎপাদনে এত আগ্রহী?
আমরা বিডাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, বাংলাদেশ সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর সকল ভেষজ ও দ্রব্য নিষিদ্ধ করার দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। যেহেতু নিকোটিন পাউচ বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন ও অপরিচিত নেশাজাত পণ্য, সেহেতু এই নতুন নেশা পণ্য উৎপাদনের অনুমোদন দিয়ে তা মাধ্যমে জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া সংবিধানের এ ধারার ও দেশের নীতির পরিপন্থী। তদুপরি, সংবিধানের ১০৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মহামান্য আপিল বিভাগের নির্দেশনা রাষ্ট্রীয় সকল সংস্থার জন্য বাধ্যতামূলক। কিন্তু বিডা ও বেজা এই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অমান্য করেছে।
২০১৬ সালের মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ (সিভিল আপিল নং ২০৪–২০৫/২০০১)-এর রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল— “দেশে নতুন কোনো তামাক বা তামাকজাত পণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিকে অনুমোদন বা লাইসেন্স প্রদান করা যাবে না।” বিডা সরকারের একটি সংস্থা হিসেবে আপিল বিভাগের এই নির্দেশনা লঙ্ঘন করে নিকোটিন পাউচ উৎপাদনের অনুমোদন দিয়েছে—যা আদালতের রায়, সংবিধান এবং সরকারের নীতির পরিপন্থী।
প্রসঙ্গত, সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টার উপস্থিতিতে দেশের ৩৫টি মন্ত্রণালয় অসংক্রামক রোগ (NCDs) নিয়ন্ত্রণে যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছে, যেখানে তামাক নিয়ন্ত্রণকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বিডা সরকারের অধীনস্থ একটি প্রতিষ্ঠান হয়েও এই ৩৫টি মন্ত্রণালয়ের সেই যৌথ ঘোষণার বিপরীতে অবস্থান নিয়ে নিকোটিন পাউচের মতো ক্ষতিকর পণ্যের অনুমোদন দিয়েছে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৭০% মানুষ অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করছে। এসব রোগের চিকিৎসা ব্যয়ের ৭০% জনগণকে নিজের পকেট থেকে বহন করার পরেও সরকার মাত্র ৩০% চিকিৎসা ব্যবয় বহন করতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে নিকোটিন পাউচের মতো ক্ষতিকর পণ্য উৎপাদনের অনুমোদন দেওয়া জনস্বাস্থ্য, যুবসমাজ ও দেশের ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ হুমকি।
আমরা, বাংলাদেশ টোব্যাকো কন্ট্রোল অ্যাডভোকেটস (বিটিসিএ) এবং বাংলাদেশ অ্যান্টি টোব্যাকো অ্যালায়েন্স (বাটা), সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি—
- নিকোটিন পাউচ উৎপাদনের অনুমোদন অবিলম্বে বাতিল করা হোক।
- বিডার এই বেআইনি ও দায়িত্বজ্ঞানহীন সিদ্ধান্তের বিষয়ে তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা হোক।
- জনস্বাস্থ্য ও আদালতের নির্দেশনার প্রতি সম্মান রেখে ভবিষ্যতে এই ধরনের ক্ষতিকর উদ্যোগ বন্ধে কঠোর নির্দেশনা জারি করা হোক।
- আমরা বিডার এই সিদ্ধান্ত বাতিলের জন্য আহ্বান জানাচ্ছি এবং নিকোটিন পাউচ উৎপাদন কারখানার অনুমোদন বাতিলের ক্ষেত্রে প্রধান উপদেষ্টার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
আমরা প্রধান উপদেষ্টার সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি—দেশের সংবিধান, আদালতের নির্দেশনা এবং দেশকে তামাকমুক্ত করার অঙ্গীকার রক্ষার্থে বিডার এই অনুমোদন অবিলম্বে বাতিল করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।