ওয়াশিংটন/তেহরান, ৮ এপ্রিল ২০২৬: মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত বালুচর থেকে হঠাৎ করেই যেন শীতল বাতাস বইতে শুরু করল। টানা ৪৮ ঘণ্টার যুদ্ধাভিমুখী টানাপোড়েন ও ‘সুন্দর বোমার’ হুমকির পর অবশেষে কূটনীতির জয় হলো। স্থানীয় সময় বুধবার সকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক আকস্মিক ঘোষণায় জানান, ইরানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি সমঝোতা হয়েছে। এই সমঝোতার আওতায় তেহরান কৌশলগত হরমুজ প্রণালীতে আন্তর্জাতিক তেলবাহী জাহাজের নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা দিয়েছে, আর বিনিময়ে ওয়াশিংটন ইরানের বিরুদ্ধে পূর্বঘোষিত ‘বিধ্বংসী হামলা’র পরিকল্পনা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে।
হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিস থেকে দেয়া এক জরুরি ভাষণে ট্রাম্প বলেন, “আমরা এখনই একটা বড় যুদ্ধ থামিয়েছি। অনেক মানুষ বলেছিল এটা অসম্ভব। কিন্তু আমার প্রশাসনের দৃঢ়তার কারণেই ইরান বুঝতে পেরেছে যে পথে হাঁটা উচিত। তারা হরমুজ প্রণালী খোলা রাখতে রাজি হয়েছে, যা গোটা বিশ্বের অর্থনীতির জন্য সুখবর।”
হরমুজের জলে স্বস্তির ঢেউ
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও বিশ্ব অর্থনীতির জন্য হরমুজ প্রণালী যেন ধমনীস্বরূপ; বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত দুদিন ধরে ইরান যদি প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয়, তাহলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছিলেন বিশ্লেষকরা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে সেই আতঙ্ক কেটে গেল।
আল জাজিরার সূত্রমতে, ওমানের রাজধানী মাস্কাটে গভীর রাতে একটি গোপন বৈঠক হয় মার্কিন ও ইরানি দূতদের মধ্যে। সেখানেই এই দ্রুত সমাধানের রূপরেখা চূড়ান্ত হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এর নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালীতে কোনো প্রকার হয়রানি বা জব্দ কার্যক্রম থেকে বিরত থাকবে। অন্যদিকে, মার্কিন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ‘ইউএসএস হ্যারি এস. ট্রুম্যান’ ওমান উপসাগরে নিজেদের অবস্থান থেকে কিছুটা পিছু হটবে এবং আকাশপথে কোনো সারপ্রাইজ হামলা চালানো হবে না।
তেহরানের ভিন্ন সুর
যদিও ট্রাম্প প্রশাসন এই ঘটনাকে ‘ইরানের পিছু হটা’ হিসেবে প্রচার করছে, তবে তেহরানের ভাষ্য কিছুটা ভিন্ন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বুধবার সকালে এক বিবৃতিতে বলেন, “আমরা কখনোই প্রণালী বন্ধ করতে চাইনি। আমরা সবসময় বলেছি, প্রতিবেশীদের নিরাপত্তা আমাদের নিরাপত্তা। এই অঞ্চলের শান্তির জন্য আমেরিকার উস্কানিমূলক যুদ্ধজাহাজগুলোকে দূরে সরিয়ে নেওয়াটাই ছিল যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত।”
স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, এটি আদতে দুই পক্ষের জন্যই ‘মুখরক্ষার একটি কৌশল’। ইরান এখনো নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো ছাড় দেয়নি, কিন্তু এই সমঝোতা তাদের ওপর থেকে তাৎক্ষণিক সামরিক আক্রমণের চাপ সরিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্প নির্বাচনী বছরে (২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে) একটি বড় যুদ্ধ এড়িয়ে নিজেকে ‘শান্তিরক্ষক’ হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ পেলেন।
তেলের বাজারে স্বস্তি, কিন্তু স্থায়ী শান্তি কি আসবে?
এই যুদ্ধবিরতির খবর প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এশিয়ার শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখী সূচক দেখা গেছে। ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯ শতাংশ কমে ৭২ ডলারের ঘরে নেমে এসেছে, যা গত ছয় মাসের মধ্যে সবচেয়ে বড় পতন।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এটি মৌলিক পারমাণবিক বিরোধের কোনো সমাধান নয়। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর এক গবেষক আল জাজিরাকে বলেন, “এটি আগুনে পানি ঢালার মতো, কিন্তু আগুনের গোড়ার কাঠগুলো রয়ে গেছে। ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলো এখনো সক্রিয় আছে। এটি কেবল ট্রাম্পের রণক্লান্ত হাতিকে কিছুক্ষণের জন্য থামিয়ে দেওয়া।”
আপাতত মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধবিমানের বদলে কূটনীতির শান্ত পায়রাই উড়ছে। আগামী সপ্তাহে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনার জন্য সুইজারল্যান্ডে দুই পক্ষের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ততদিন পর্যন্ত হরমুজ প্রণালীর বুকে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকবে, আর বিশ্ববাসী কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারবে।
Source:Alja-zeera