২৪তম দিন। বিস্ফোরণ থামেনি
একটা সংখ্যা আছে, যেটা প্রতিদিন বাড়ছে। এখন সেটা দাঁড়িয়েছে ১,৫০০-তে। এটাই ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া নিহতের সংখ্যা, যেদিন থেকে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশটিতে হামলা শুরু করেছে। কিন্তু এই সংখ্যার পেছনে যে বিবরণ আছে, সেগুলো পড়তে কষ্ট লাগে।
নিহতদের বয়স ছিল আট মাস থেকে ৮৮ বছর পর্যন্ত। ২০০ জন নারী। মিনাব শহরের একটি মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৬৮টি শিশু মারা গেছে।
শেষের তথ্যটা — একটা প্রাথমিক বিদ্যালয় — পড়তে পড়তে থেমে যেতে হয়।
কীভাবে এখানে পৌঁছালাম আমরা?
হামলা শুরু হয়েছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে যে সেই তারিখ থেকে আজ পর্যন্ত ইরানে ৭,০০০-এরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। সংখ্যাটা নিয়ে একটু বসলে মাথা ঘুরে যায় — এক মাসেরও কম সময়ে সাত হাজার লক্ষ্যবস্তু।
ইরান চুপ থাকেনি। ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) জানিয়েছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে, পাশাপাশি তেল আবিব ও ইসরায়েলের অন্যান্য অংশে সামরিক স্থাপনায়ও আঘাত হেনেছে।তেহরানের যুক্তিটা আগে থেকেই পরিষ্কার ছিল — তারা বলে এসেছিল যে আক্রান্ত হলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকেই তারা বৈধ লক্ষ্য মনে করে।
তারপর ইসরায়েল হামলা করল সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে। সেই উত্তেজনার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল গোটা উপসাগলীয় অঞ্চলে।
আঞ্চলিক ডমিনো প্রভাব
এটা আর দুটো দেশের সংঘাত নেই। ইরান এখন পর্যন্ত নয়টি দেশে হামলা চালিয়েছে — বাহরাইন, ইরাক, জর্দান, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত — এবং একটি ইরানি ড্রোন সাইপ্রাসে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটির রানওয়েতেও আঘাত হেনেছে।
উপসাগরীয় দেশগুলো — যাদের ভূখণ্ডে মার্কিন ঘাঁটি আছে — হঠাৎ করে নিজেদের এক সংকটময় অবস্থানে আবিষ্কার করল। সৌদি আরব ও আমিরাত জানিয়েছে ইসরায়েলের সাউথ পার্স হামলার পর তাদের জ্বালানি স্থাপনায়ও ইরানি হামলা হয়েছে। বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের দাম লাফিয়ে উঠল।
আমিরাত তার শেয়ারবাজার বন্ধ করে দিল। কাতার এনার্জি — পৃথিবীর সবচেয়ে বড় LNG উৎপাদনকারী — উৎপাদন স্থগিত করল। কাতারে রমজানের সব জনসমাগম বাতিল হলো। স্কুলগুলো অনলাইনে চলে গেল।
রক্তের হিসাব
এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া তথ্য অনুযায়ী:
ইরান সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। কমপক্ষে ১,৫০০ জন নিহত ও ১৮,৫৫১ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৫৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী আহত ও ১১ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে চারজন চিকিৎসক, দুজন নার্স এবং তিনজন জরুরি কর্মী।
লেবানন একই সময়ে তার নিজস্ব বিপর্যয়ে ডুবে আছে। ইসরায়েল গত সোমবার দেশটিতে ব্যাপক হামলা পুনরায় শুরু করার পর থেকে ১,০০১ জন নিহত ও ২,৫৮৪ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে অন্তত ১১৮ জন শিশু। দশ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
ইরাকে কমপক্ষে ৬১ জন নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগ পপুলার মবিলাইজেশন ফোর্সেস (PMF)-এর সদস্য।
মার্কিন সেনারাও রেহাই পাননি। ইরানি হামলায় ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত ও প্রায় ২০০ জন আহত হয়েছেন। ১৩ মার্চ পশ্চিম ইরাকে একটি মার্কিন জ্বালানি বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ছয়জন ক্রু সদস্য মারা যান।
ইসরায়েলে ১৮ জন নিহত ও ৩,৭৩০-এরও বেশি আহত হয়েছেন। ১ মার্চ মধ্য ইসরায়েলের বেইত শেমেশে একটি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একাই নয়জন নিহত হন।
যে কথাটা কেউ সরাসরি বলতে চাইছে না
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪০,০০০ থেকে ৫০,০০০ সেনা মোতায়েন রয়েছে, অন্তত ১৯টি সামরিক স্থাপনায় — যার মধ্যে বাহরাইন, মিশর, ইরাক, জর্দান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে আটটি স্থায়ী ঘাঁটি রয়েছে। এটা একটা বিশাল উপস্থিতি — এবং এই মুহূর্তে প্রতিটি ঘাঁটি সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু।
যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ইরানকে ঘিরে। কিন্তু এটা এখন এমন কিছুতে রূপান্তরিত হয়েছে যা সাইপ্রাসকে ছুঁয়েছে, উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামোকে হুমকিতে ফেলেছে — যার উপর গোটা পৃথিবী নির্ভরশীল — এবং অন্তত ছয়টি দেশে বেসামরিক মানুষ মেরেছে।
বিস্ফোরণ এখনও থামেনি। ২৪তম দিন।
সূত্র: আল জাজিরা লাইভ ট্র্যাকার, মার্কিন CENTCOM, ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ইরাকি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। সব হতাহতের সংখ্যা প্রাথমিক এবং পরিবর্তনযোগ্য।