খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য: সংকটে আছেন, তবে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন

এভারকেয়ার হাসপাতালের বাইরে উদ্বিগ্ন মানুষের ভিড়, ভেতরে চলছে লড়াই—বেঁচে থাকার লড়াই। বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া গত সাত দিন ধরে এই হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন। ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রে সংক্রমণের জটিলতা নিয়ে তাঁর অবস্থা এখনো সংকটাপন্ন, তবে স্থিতিশীল।

গতকাল শনিবার গুলশানে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সোজাসাপটা বলেছেন, “শারীরিক অবস্থা কিছুটা সংকটাপন্ন। তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দিয়ে তাঁর চিকিৎসা চলছে।”

দেশ-বিদেশের ডাক্তারদের যৌথ প্রচেষ্টা

আমেরিকার জন হপকিন্স, মাউন্ট সিনাই, লন্ডন ক্লিনিক, সিঙ্গাপুর, চীন, সৌদি আরবসহ বিশ্বের নামকরা হাসপাতালের চিকিৎসকরা যৌথভাবে পরামর্শ দিচ্ছেন খালেদা জিয়ার চিকিৎসায়। শুক্রবার রাতে দীর্ঘ সময় ধরে মেডিক্যাল বোর্ড বৈঠক হয়েছে, আলোচনা হয়েছে চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে।

খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন গত রাতে হাসপাতালের সামনে সংবাদ সম্মেলনে জানান, “দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবস্থা একই পর্যায়ে রয়েছে। তিনি চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারছেন। সারা পৃথিবীতে যে ভালো চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রয়োজন, সেটি এখানে আয়োজন করা হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “চিকিৎসা করার দায়িত্ব হাসপাতালের। ভালো করার মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। আপনারা সবাই দোয়া করবেন।”

এখনো শঙ্কা কাটেনি

হাসপাতালে খালেদা জিয়াকে দেখতে আসা বিভিন্ন নেতা-কর্মীদের কথায় উঠে এসেছে, তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল থাকলেও এখনো তিনি সম্পূর্ণ শঙ্কামুক্ত নন।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন গতকাল দুপুরে বলেন, “আগের মতোই অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। স্ট্যাবল আছেন, কিন্তু এখনো ইমপ্রুভ করেননি।”

এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. তাসনিম জারা তাঁকে দেখার পর জানান, “উনি সজ্ঞানে আছেন, সজাগ আছেন। চিকিৎসক ও নার্স যে নির্দেশনা দিচ্ছেন, সেগুলো তিনি অনুসরণ করতে পারছেন। তাঁর অবস্থা ক্রিটিক্যাল, তবে ফাইট করছেন।”

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক খালেদা জিয়ার খোঁজ নিয়ে বলেন, শারীরিক অবস্থা কিছুটা স্বস্তিদায়ক ও আশাব্যঞ্জক।

শুক্রবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস হাসপাতাল থেকে বের হয়ে বলেন, “আমরা দূরত্ব বজায় রেখে উনার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছি। উনি আমাদের চিনতে পেরেছেন এবং সালাম দিয়েছি, উনি জবাব দিয়েছেন।”

বিদেশে নেওয়ার পরিকল্পনা আছে, কিন্তু…

খালেদা জিয়াকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করেছেন মির্জা ফখরুল। তবে তিনি জানান, এই মুহূর্তে তাঁর শারীরিক অবস্থা বিমানে করে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার মতো নয়।

“হয়তো বিদেশে নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু তাঁর এখন যে শারীরিক অবস্থা, সে অবস্থায় তাঁকে বিদেশে নেওয়ার মতো নন। শারীরিক অবস্থা স্ট্যাবল হলে তখন চিন্তা করে দেখা হবে,” তিনি বলেন।

তবে আশার কথা হলো, ভিসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয়ে কাজ এগিয়ে রাখা হয়েছে। মির্জা ফখরুল জানান, “যদি দেখা যায় উনি রেডি টু ফ্লাই, তখন তাঁকে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হবে।”

বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন ফেসবুকে জানিয়েছেন, লন্ডনে যেসব চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে খালেদা জিয়া চার মাস চিকিৎসা নিয়ে অনেকটা সুস্থ হয়েছিলেন, তাদের সঙ্গে তারেক রহমান ও তাঁর স্ত্রী যোগাযোগ করেছেন।

ডা. জাহিদ হোসেন বলেন, “বিদেশে নেওয়ার বিষয়টি নির্ভর করছে তাঁর শারীরিক সুস্থতা ও মেডিক্যাল বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর।”

হাসপাতালের সামনে ভিড়ে বিঘ্ন

খালেদা জিয়ার অসুস্থতার খবর পেয়ে শুক্রবার রাত থেকেই এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে ভিড় জমাতে শুরু করেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। শুভেচ্ছা বার্তাসংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে অবস্থান করেন তারা, দোয়া মাহফিল করেন, তবারক বিতরণ করেন।

কিন্তু এই ভিড়ে সমস্যা হচ্ছে চিকিৎসা কার্যক্রমে। যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, রোগী পরিবহনে সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

মির্জা ফখরুল সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, “আপনাদের মাধ্যমে আমি দেশের সাধারণ মানুষের কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দিতে চাই—বিএনপি চেয়ারপারসন ও দেশনেত্রীর অসুস্থতার খবরে পুরো দেশবাসী উদ্বিগ্ন। অনেকেই হাসপাতালের সামনে এসে ভিড় করছেন। এতে খালেদা জিয়াসহ অন্য রোগীদের চিকিৎসা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং ডাক্তাররাও বিরক্তবোধ করছেন। আমি সবাইকে ভিড় না করার অনুরোধ জানাচ্ছি।”

বিএনপি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে নেতা-কর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের হাসপাতালে না আসার অনুরোধ জানিয়েছে।

রাজনৈতিক নেতাদের সমবেদনা

খালেদা জিয়াকে দেখতে হাসপাতালে গেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। গতকাল স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী হাসপাতালে গিয়ে খোঁজখবর নেন।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রধান সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মুহাম্মাদ মামুনুল হক, হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব জুনায়েদ আল হাবিব, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থসহ অনেকেই এসেছেন।

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের পৃথক বার্তায় খালেদা জিয়ার দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন।

রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনূসও তাঁর সুস্থতা কামনা করেছেন। গতকাল প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ সভায় তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনা করে দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন মোনাজাত পরিচালনা করেন।

দেশজুড়ে দোয়ার আয়োজন

শুক্রবার দেশব্যাপী মসজিদে মসজিদে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে বিএনপি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদেও বাদ আসর সাদা দলের উদ্যোগে মিলাদ মাহফিল ও দোয়ার আয়োজন করা হয়। উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রো-ভিসিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান জিয়া পরিবারের পক্ষ থেকে সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।

পরিবারের পাশে

খালেদা জিয়ার পাশে রয়েছেন তাঁর ছোট ছেলে মরহুম আরাফাত রহমান কোকোর সহধর্মিণী সৈয়দা শর্মিলা রহমান এবং তাঁর ভাই সাঈদ এস্কান্দার। সার্বিক সহযোগিতা করছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সব স্তরের নেতা-কর্মীরা।

৭৯ বছর বয়সী এই নেত্রীর জন্য এখন শুধু অপেক্ষা—সুস্থতার অপেক্ষা। ডাক্তাররা তাদের সেরাটা দিচ্ছেন, পরিবার পাশে আছে, দেশজুড়ে মানুষ দোয়া করছে।

আর খালেদা জিয়া? তিনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন—বেঁচে থাকার লড়াই।

Share This News