লেখক: কাজী মোহাম্মদ হাসিবুল হক, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ কর্মী
বাংলাদেশে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা সম্প্রসারণ এবং সরকারিভাবে ওষুধের মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্ত দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত মোড় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই উদ্যোগকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি দেশের মানুষের আয়, চিকিৎসা ব্যয়ের বাস্তবতা এবং রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিদ্যমান পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের বড় অংশ এখনও জনগণের নিজস্ব আয়ের ওপর নির্ভরশীল, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যকে আরও প্রকট করে তুলছে।
বর্তমানে দেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষের নিজস্ব পকেট থেকে ব্যয় হয়। বিভিন্ন সরকারি ও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য প্রতিবেদনে এই ‘আউট-অব-পকেট’ ব্যয়ের হার প্রায় ৬৮ থেকে ৭৩ শতাংশের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ একজন রোগীর চিকিৎসা ব্যয়ের মূল বোঝা রাষ্ট্র নয়, বরং ব্যক্তি ও পরিবারকেই বহন করতে হচ্ছে। এই বাস্তবতায় ওষুধের দাম সামান্য বেড়ে গেলেও তা সরাসরি পরিবারের মাসিক বা বাৎসরিক আয়ের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে চিকিৎসা ব্যয় অনেক সময় ঋণ, সম্পদ বিক্রি কিংবা প্রয়োজনীয় অন্যান্য খরচ কমানোর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের দিক থেকে চিত্রটি আরও স্পষ্ট। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় জিডিপির প্রায় শূন্য দশমিক সাত থেকে শূন্য দশমিক আট শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে বিভিন্ন বাজেট বিশ্লেষণ ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মাথাপিছু সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এখনও কম, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত পরিমাণের নিচে অবস্থান করছে। এই সীমিত সরকারি বিনিয়োগের কারণে সরকারি হাসপাতাল ও সেবাকেন্দ্রগুলোতে ওষুধের ঘাটতি, সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন এবং বেসরকারি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা সম্প্রসারণ এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত একটি কাঠামোগত হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। নিত্যপ্রয়োজনীয় ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধ সরকার নির্ধারিত দামে নিশ্চিত করা গেলে চিকিৎসা ব্যয়ের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। যেহেতু স্বাস্থ্য ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য অংশই ওষুধ কেনার পেছনে ব্যয় হয়, তাই এই নীতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে আউট-অব-পকেট ব্যয় কমার বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এর ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য চিকিৎসা গ্রহণ আর্থিকভাবে তুলনামূলক সহজ হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে নিয়মিত ওষুধ গ্রহণে বাধা কমবে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও ইঙ্গিত দেয় যে, যেসব দেশ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধকে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে, সেখানে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামগ্রিক ফলাফল উন্নত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দীর্ঘদিন ধরেই সদস্য দেশগুলোকে জাতীয় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে আসছে। অনেক উন্নয়নশীল দেশ এই নীতির সঙ্গে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি ও শক্তিশালী বাজার তদারকির সমন্বয় ঘটিয়ে স্বাস্থ্য খাতে পকেটভর্তি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সক্ষম হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে কেবল ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণেই সীমাবদ্ধ না থেকে বৃহত্তর স্বাস্থ্য অর্থনীতির সংস্কারের পথ তৈরি করতে পারে। যদি এই নীতির সঙ্গে কার্যকর নজরদারি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি স্বাস্থ্য বাজেট ধীরে ধীরে বাড়ানোর পদক্ষেপ যুক্ত করা যায়, তাহলে তা সার্বজনিক স্বাস্থ্য সূচক উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। তবে বাস্তবায়নের ঘাটতি থাকলে কিংবা বাজার তদারকিতে দুর্বলতা দেখা দিলে এই নীতির কাঙ্ক্ষিত সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে কি না, সে প্রশ্নও থেকেই যায়।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের মানুষের আয়-ব্যয়ের বাস্তবতা ও রাষ্ট্রের সীমিত স্বাস্থ্য বিনিয়োগের প্রেক্ষাপটে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মূল্য নির্ধারণ একটি প্রয়োজনীয় ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এটি সঠিকভাবে কার্যকর হলে দেশের স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত বৈষম্য কমানোর পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি হতে পারে, যা কেবল বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি টেকসই অর্জন হিসেবে বিবেচিত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।