শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় — গাছ রোপণ শুধু পরিবেশ রক্ষার কাজ নয়, এটি গ্রামীণ নারীদের সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। শনিবার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ওয়ান আর্থ ফেস্টিভ্যাল’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার।
পরিবেশবাদী সংগঠন ‘এক টাকায় বৃক্ষরোপণ’ আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে উপদেষ্টা বলেন, “গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামের অনেক নারী তাদের ভবিষ্যৎ সামাজিক নিরাপত্তার কথা ভেবেই গাছ লাগান। এটা শুধু পরিবেশ সচেতনতা নয়, এটা তাদের বেঁচে থাকার কৌশল।”
নোবেল বিজয়ী থেকে শেখার আছে অনেক কিছু
কেনিয়ার নোবেল বিজয়ী পরিবেশকর্মী ওয়াঙ্গারি মাথাইয়ের উদাহরণ টেনে ফরিদা আখতার বলেন, বিশ্বে শুধু গাছ লাগিয়েই অনেকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি পেয়েছেন। মাথাই তার জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পরিবেশ রক্ষার প্রতিশ্রুতি রেখে গেছেন,এমনকি কচুরিপানা দিয়ে তৈরি বায়োডিগ্রেডেবল কফিনে সমাহিত হওয়ার নির্দেশও দিয়ে গেছেন।
হাওর ধ্বংসের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবাণী
হাওর অঞ্চলের পরিবেশ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, করচ ও হিজলের মতো দেশীয় জলজ গাছ নির্বিচারে কাটায় হাওরের স্বাভাবিক চরিত্র নষ্ট হচ্ছে, মাছের আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। কৃষি রক্ষার নামে যেখানে-সেখানে বাঁধ দিয়ে পানি প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, যা মাছের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
“টাঙ্গুয়ার হাওরে দায়িত্বহীন পর্যটনের ভয়াবহ চিত্র দেখছি আমরা,” বলেন ফরিদা আখতার। “পর্যটকরা প্লাস্টিক, সিগারেটের ফিল্টার ফেলে যাচ্ছেন, যা মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্যের জন্য বিষের মতো কাজ করছে। এটা অপরাধ, অন্য কিছু নয়।”
শিল্প দূষণে বিপন্ন ইলিশ
নারায়ণগঞ্জসহ শিল্পাঞ্চলগুলোতে ইটিপি সঠিকভাবে ব্যবহার না হওয়ার তীব্র সমালোচনা করেন উপদেষ্টা। তিনি জানান, শীতলক্ষ্যা নদীর দূষণের প্রভাব পড়ছে পুরো মেঘনা অববাহিকায়, যার ফলে ইলিশসহ গুরুত্বপূর্ণ মাছের প্রজনন হুমকির মুখে পড়েছে।
সমুদ্রের সম্পদ রক্ষায় কঠোর অবস্থান
সমুদ্রে মাছ ধরার ক্ষেত্রে সোনার প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেন ফরিদা আখতার। দেশের প্রায় ২৩৫টি শিল্প ট্রলারের মধ্যে অন্তত ৭০টিতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্বিচারে সব প্রজাতির মাছ ধরা হচ্ছে।
“সাম্প্রতিক জরিপে বাংলাদেশের সমুদ্র এলাকায় ৪৭৫ প্রজাতির জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ৫টি প্রজাতি বিশ্বে একেবারেই অনন্য,” জানান তিনি। “এই মূল্যবান সম্পদ ধ্বংসের ঝুঁকি নেওয়া যায় না কোনোভাবেই।”
ভেনামি চিংড়িতে ‘না’
ভেনামি চিংড়ি প্রসঙ্গে স্পষ্ট অবস্থান জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, এটি একটি বিদেশি ও ইনভেসিভ প্রজাতি, যা দেশীয় গলদা ও বাগদা চিংড়ির জন্য মারাত্মক হুমকি। বাণিজ্যিক চাপ যতই থাকুক, দেশীয় প্রজাতির ক্ষতি হয়—এমন কোনো অনুমোদন দেওয়া হবে না বলে তিনি দৃঢ়ভাবে জানান।
পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতার পাশাপাশি কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, “প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শুধু ব্যবহারের নয়, সহাবস্থানের। আর এই সহাবস্থান টিকিয়ে রাখতে হলে দায়িত্বশীল আচরণ করতেই হবে।”