জামায়াতের ঐতিহাসিক সুযোগ: বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের আভাস

ঢাকা: ১৫ বছরের নিপীড়ন থেকে উঠে আসা একটি দল এখন বাংলাদেশে ক্ষমতার দোরগোড়ায়। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শুধু একটি ভোট নয়—এটি হতে পারে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় মোড় ঘোরার মুহূর্ত।

গত আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর এটাই দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ায় মূলত দ্বিমুখী লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে এবারের নির্বাচন—একদিকে বিএনপি, অন্যদিকে জামায়াত-ই-ইসলামী ও তার সহযোগী দলগুলোর জোট।

সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, বিএনপি ৩৩ শতাংশ এবং জামায়াত ২৯ শতাংশ সমর্থন নিয়ে অবস্থান করছে । আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো, বাংলাদেশি কয়েকটি সংস্থার যৌথ জরিপে এই ব্যবধান মাত্র এক শতাংশে নেমে এসেছে—বিএনপি ৩৪ দশমিক ৭ এবং জামায়াত ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশ ।

ইতিহাসের পাতায় জামায়াতের অতীত বিতর্কিত। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করায় দলটি দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় জনগোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছিল। কিন্তু দলের বর্তমান নেতারা যুক্তি দেখাচ্ছেন যে, হাসিনা সরকারের ১৫ বছরের নিপীড়ন তাদের প্রতি জনগণের সহানুভূতি সৃষ্টি করেছে।

জামায়াতের নায়েবে আমির ড. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্দ তাহের আল-জাজিরাকে বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষ ৫৫ বছর ধরে শুধু আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শাসন দেখেছে এবং এখন তারা একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষমতায় দেখতে চায় ।

দলটি নিজেকে একটি ‘মধ্যপন্থী ইসলামি শক্তি’ হিসেবে তুলে ধরছে। এবারই প্রথম জামায়াত খুলনার কৃষ্ণ নন্দী নামে একজন হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে , যা দলটির পরিবর্তনের একটি সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে জামায়াতের ক্ষমতায় আসা নিয়ে উদ্বেগও কম নয়। অনেকে আশঙ্কা করছেন, একটি ইসলামি দল ক্ষমতায় এলে শরিয়া আইন কার্যকর হতে পারে বা নারী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার সংকুচিত হতে পারে। যদিও জামায়াত নেতারা বলছেন, তারা বিদ্যমান সংবিধানের আওতায়ই সংস্কার করবেন।

আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের টমাস কিন বলেছেন, জামায়াত ক্ষমতায় এলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে, কারণ বিজেপি ও জামায়াতের মধ্যে আদর্শিক সংঘাত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জটিল করতে পারে । একই সঙ্গে, হাসিনার পতনের পর পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নতির দিকে যাচ্ছে, যা জামায়াতের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে।

জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রধান ক্যাম্পাসগুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেছে , যা দলের তৃণমূল পর্যায়ের শক্তি প্রদর্শন করে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জামায়াত এর আগে কখনো ২০টির বেশি আসন বা ১২ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি । কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি এবং বিএনপির প্রতি ক্রমবর্ধমান হতাশা জামায়াতকে একটি বিকল্প শক্তি হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ দিয়েছে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটই নির্ধারণ করবে যে, দীর্ঘ বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা এই দল তাদের সাংগঠনিক শক্তিকে রাষ্ট্রীয় বৈধতায় রূপান্তরিত করতে পারবে কিনা। যা-ই হোক না কেন, এই নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।

Share This News