দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে তামাক ব্যবহারে বাংলাদেশ শীর্ষে স্থানে অবস্থান করছে; পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে তামাক ব্যবহারের দিক থেকে শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে অন্যতম। দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের কারণ অসংক্রামক রোগ এবং এ সকল রোগের অন্যতম প্রধান কারণ তামাকের ব্যবহার। তামাক শুধু স্বাস্থ্য খুণ্ন, অর্থনীতি ও পরিবেশের ক্ষতিসাধন করে। তামাক ব্যবহারজনিত বিভিন্ন মারাত্মক রোগের চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদী ও ব্যয়বহুল হওয়ায় ব্যক্তি ও পরিবারে আর্থিক ক্ষতির দীর্ঘসূত্রিতা হয়। একইভাবে, তামাক চাষের কারণে জমির উর্বরতা নষ্ট হয়। এছাড়াও, তামাক পাতা পোড়াতে জ্বালানির জন্য প্রচুর পরিমাণে গাছ কাটায় পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং পোড়ানোর সময় সৃষ্ট ধোঁয়াও পরিবেশের জন্য ক্ষতি করে। তামাকের এসব ক্ষতিকর দিক বিবেচনায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
গত দুই দশকে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে তামাক নিয়ন্ত্রণে বেশিকিছু সাফল্য অর্জিত হয়েছে। ২০০৫ সালে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৭ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল গঠন, ২০১৩ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন, ২০১৫ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা, ২০১৭ সালে স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ নীতিমালা, ২০১৯ সালে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন নির্দেশিকা, ২০২২ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল বিধিমালা, ২০২৩ সালে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ এবং ২০২৩ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে করা হয়েছে। এছাড়া, তামাকমুক্ত গড়ার ক্ষেত্রে তামাক ব্যবহার কমানোর কারণ বিবেচনায় ২০৪০ সালের মধ্যে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) তামাক নিয়ন্ত্রণে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থাৎ জাতীয় তামাক সেল তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন, নীতি প্রণয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, সমন্বয়, গবেষণা ও মনিটরিং, আইন শক্তিশালীকরণ, মোট প্রচার প্রযোগ এবং কর্ম বুদ্ধির পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি কয়েকটি মৌলিক কার্যক্রমে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এছাড়াও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ মন্ত্রণালয়, হত্যা ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর পক্ষ থেকে তামাক নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে।
সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে নিশ্চিতকরণে স্থানীয় সরকার, পুষ্টি উম্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। স্থানীয় সরকার, পুষ্টি উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত তামাক নিয়ন্ত্রণ নির্দেশিকা অনুযায়ী বেশ কিছু স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান তামাক নিয়ন্ত্রণে আর্থিক বরাদ্দ রেখেছে। যদিও দেশের মোট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সংখ্যায় সাথে তুলনামূলক পাঠী অত্যন্ত কম। তবে, সকল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে একটি নির্দিষ্ট অর্থায়ন ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করা হলে স্থানীয় পর্যায়ে তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি জোরদার করা সম্ভব হবে।
২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটে প্রথমবারের মতো তামাকজাত দ্রব্যের ওপর এক শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ ক্ষমা হয়। ২০১৭ সালে স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ ব্যবস্থাপনা নীতি প্রণয়ন করা হলেও জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি ছাড়ায় বা করায় এ খাতের অর্থ যথাযথভাবে তামাক নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করা সম্ভব হয়নি। ফলস্বরূপ, দেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আন্তর্জাতিক অঙ্গন ও সমকামী সম্পর্কের উপলব্ধ প্রসারহীন: কোনো নির্দিষ্ট বা স্থায়ী আর্থিক ব্যবস্থা না থাকায় ব্যয় বৃদ্ধিসাধানে প্রশস্ত ও বাস্তবায়ন সমান সূত্রে উঠতেছে না।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তামাক কর বা সারচার্জ থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব জাতীয় পর্যায়ে তামাক নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন কার্যক্রমে দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়ন নিশ্চিত করতে টেকসই অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সক্রিয় রয়েছে। সেখানে, সবচেয়ে প্রচালিত পদ্ধতি হলো তামাকজাত পণ্যের ওপর আমদানির আরেকটি কর্ক (Excise Tax) একটি নির্দিষ্ট অংশ বাহ্য প্রস্তুত বরাদ্দ করা। উদাহরণস্বরূপ, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ এশীয়ায় তামাক কমছে সারচার্জ থেকে একটি স্বাধীন স্বাস্থ্য উন্নয়ন তহবিল পরিচালনা করা হয়। ফিলিপাইনে তামাক ও হ্যান্ডকেপ ওপর আমদানির ওপর ট্যাক্সের থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন কার্যক্রমে ব্যয় করা হয়। ভিয়েতনামে তামাক উৎপাদক ও আমদানিকারকদের বাধ্যতামূলক অবদানের মাধ্যমে তামাক নিয়ন্ত্রণ তহবিল পরিচালনা করা হয়। এছাড়া যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, লিথুয়ানিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাজ্যর তামাক কর, সরকারি বাহ্য বাজেট, আইডি কিপার্স থেকে প্রাপ্ত তহবিল এবং জবসংস্থা উৎপাদনের ক্ষেত্রে তামাক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এসব দেশের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, নির্দিষ্ট ও আইনিসম্মত অর্থায়ন ব্যবস্থা তামাক নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রমে দীর্ঘমেয়াদে আরও কার্যকর ও টেকসই করে তোলে।
ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে তামাক নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশ কিন্তু সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এ সকল প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অসংক্রামক রোগ প্রতিমোদে উদাহরণ সৃষ্টিগামী দেশগুলোর মতো বাংলাদেশে একটি বিধিবদ্ধ টেকসই অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। যা স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জের অর্থেরও যথাযথ ব্যবহার ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের আর্থিক বরাদ্দ নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি শক্তিশালী করবে।
লেখক: কৃষ্ণা বসু, সমাজ উন্নয়ন কর্মী।