মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। শনিবার তাঁর কম্পাউন্ডে এই হামলা চালানো হয়। ট্রাম্প বলেন, খামেনি এবং অন্যান্য ইরানি কর্মকর্তারা “মার্কিন গোয়েন্দা ও উন্নত ট্র্যাকিং সিস্টেম থেকে বাঁচতে পারেননি।”
সর্বোচ্চ নেতার পদে আসীন
১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর খামেনি ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের হাল ধরেন। খোমেনি ছিলেন ইসলামি বিপ্লবের আদর্শিক শক্তি, আর খামেনি ছিলেন সেই সামরিক ও আধাসামরিক কাঠামোর নির্মাতা — যা একদিকে ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অন্যদিকে দেশের বাইরেও প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার।
সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার আগে তিনি ১৯৮০-র দশকে ইরাকের সাথে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সময় ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। সেই যুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলো ইরাকি নেতা সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থন দিয়েছিল, যা খামেনির মনে পশ্চিম এবং বিশেষত আমেরিকার প্রতি গভীর অবিশ্বাস জন্ম দেয়।
ইরানি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ভালি নাসর বলেন, “মানুষ মনে করে এটি একটি ধর্মতন্ত্র। কিন্তু বাস্তবে, তিনি ছিলেন যুদ্ধকালীন একজন প্রেসিডেন্ট, যিনি এই বিশ্বাস নিয়ে বের হয়েছিলেন যে ইরান দুর্বল এবং নিরাপত্তার প্রয়োজন।”
এই দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) একটি আধাসামরিক বাহিনী থেকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

শৈশব ও শিক্ষা
১৯৩৯ সালে ইরানের উত্তর-পূর্বে পবিত্র শিয়া শহর মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন খামেনি। তাঁর বাবা একজন প্রখ্যাত মুসলিম ধর্মীয় নেতা ছিলেন। মাত্র চার বছর বয়সে কোরআন শিক্ষা শুরু করেন এবং পরে নাজাফ ও কোমের বিখ্যাত শিয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন। কোমে তিনি আয়াতুল্লাহ খোমেনির সাথে পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ হন। রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে শাহের গোপন পুলিশ (SAVAK) তাঁকে বারবার গ্রেপ্তার করে এবং নির্বাসনে পাঠায়।
পরীক্ষার মুহূর্তগুলো
২০০৯ সালের সবুজ আন্দোলন: বিতর্কিত নির্বাচনের প্রতিবাদে লক্ষাধিক মানুষ রাস্তায় নামলে খামেনি কঠোরভাবে দমন করেন। হাজার হাজার গ্রেপ্তার, কয়েক ডজন নিহত।
২০২২ সালের মাহসা আমিনি আন্দোলন: বাধ্যতামূলক হিজাব আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে পুলিশ হেফাজতে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর ব্যাপক বিক্ষোভ। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অনুযায়ী পাঁচশোরও বেশি মানুষ নিহত।
২০২৫ সালের শেষে মুদ্রা সংকট: অর্থনৈতিক দুরবস্থায় দেশজুড়ে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। ইরানি কর্তৃপক্ষ বলেছে তিন হাজারের বেশি নিহত, তবে মার্কিন-ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসেবে সংখ্যাটি সাত হাজারের বেশি।

পারমাণবিক কর্মসূচি ও কূটনীতি
খামেনি একজন বাস্তববাদীও ছিলেন। ২০১৫ সালে কঠোর নিষেধাজ্ঞার চাপে তিনি রাষ্ট্রপতি রুহানিকে পশ্চিমের সাথে আলোচনার অনুমতি দেন, যা JCPOA চুক্তির জন্ম দেয়। কিন্তু ২০১৮ সালে ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পর ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুনরায় শুরু করে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত।
ভালি নাসরের ভাষায়, “পারমাণবিক চুক্তি ছিল মার্কিনিদের সাথে স্বাভাবিকীকরণ নয়, বরং যেভাবে আমেরিকা সোভিয়েতদের সাথে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি করেছিল — ঠিক তেমন কিছু।”
প্রতিরোধের অক্ষ’ এবং পতন
খামেনির সবচেয়ে প্রভাবশালী কৌশলগত প্রকল্প ছিল “প্রতিরোধের অক্ষ” — লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনে হামাস, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ে তৈরি একটি আঞ্চলিক মিত্রজোট। এই কৌশলের প্রধান রূপকার ছিলেন কাসেম সোলেইমানি, যাঁকে ২০২০ সালে মার্কিন হামলায় হত্যা করা হয়।
তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর থেকে এই অক্ষ ভাঙতে শুরু করে। ইসরায়েল গাজায় যুদ্ধ শুরু করে, হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতৃত্ব হত্যা করে, এবং ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন ঘটে।

সর্বশেষ পরিণতি
২০২৫ সালের জুন মাসে ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও সামরিক পরিকাঠামোতে ব্যাপক হামলা চালায়। ইরান টেল আবিবে ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে পাল্টা জবাব দেয়। প্রায় দুই সপ্তাহের পূর্ণ যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় বাংকার-বাস্টার বোমা ফেলে।
এরপরও খামেনি বলেছিলেন, “ইরানি জাতি কখনো আত্মসমর্পণ করবে না।”
অবশেষে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় তাঁর কম্পাউন্ড ধ্বংস হয় এবং ট্রাম্প তাঁর মৃত্যু ঘোষণা করেন। ট্রাম্প ইরানি জনগণকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “তোমাদের স্বাধীনতার সময় এসেছে। আমাদের কাজ শেষ হলে তোমাদের সরকার নিজেরা নাও।”
সূত্র: আল জাজিরা