একটি কন্যা শিশু জন্ম নিলে ঘরে যেন আলো আসে। বাবার বুকে জমে ওঠে অপার ভালোবাসা — কীভাবে সাজাবে, কীভাবে বড় করবে, কোন পোশাকে আরও সুন্দর দেখাবে। মায়ের মনে জাগে স্বস্তির নিঃশ্বাস — এই মেয়ে একদিন পাশে দাঁড়াবে, কাজে সাহায্য করবে, ঘর আলো করে রাখবে। কন্যা শিশু শুধু ঘর সামলায় না — সে বড় হয়ে দেশ সামলায়, প্রশাসন চালায়, সন্তান ও সংসার একসাথে বহন করে। তবু এই কন্যা শিশু সামর্থ্যবান হওয়ার আগেই কিছু নরপিশাচের লোলুপ দৃষ্টিতে পড়ে যায়।
মাগুরার ৮ বছর বয়সী আছিয়া ২০২৫ সালের মার্চ মাসে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মৃত্যুবরণ করে। তার মৃত্যুতে সারা বাংলাদেশ কেঁদেছিল
এরপর এলো রামিসা। রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে প্রতিবেশী সোহেল রানা প্রথমে ধর্ষণ করে, তারপর গলা কেটে হত্যা করে। লাশ গুম করতে মাথা ছুরি দিয়ে আলাদা করা হয় এবং দেহ খাটের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়। এই বর্বরতার কোনো ভাষা নেই।এই নামগুলো এখন শুধু স্মৃতি নয়, এগুলো আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার জীবন্ত দলিল।
কিছু মানুষ আছে যাদের চোখে নারী মানেই ভোগের পণ্য। তাদের মাথায় প্রশ্ন জাগে না — কেন একটি মেয়ে হাসবে না? কেন খেলবে না? কেন তার ছোটাছুটির অধিকার নেই? এই বিকৃত মানসিকতা আজ সমাজের গভীরে শিকড় গেড়েছে। আর এই শিকড় উপড়ে ফেলার দায়িত্ব যে রাষ্ট্রের, সেই রাষ্ট্র বারবার পিছিয়ে পড়েছে।
তনুর কথা মনে আছে? কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের মেধাবী শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনু ২০১৬ সালের ২০ মার্চ নিহত হন। দশটি বছর পেরিয়ে গেছে। এই দশ বছরে তদন্ত সংস্থা বদলেছে চারবার, তদন্ত কর্মকর্তা বদলেছে ছয়বার। সম্প্রতি মামলায় একজন সন্দেহভাজন সাবেক সেনাসদস্যকে গ্রেফতার করে তিন দিনের রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অন্য দুই সন্দেহভাজনের একজন দেশের বাইরে পালিয়ে গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, অন্যজন দেশেই আত্মগোপনে। গ্রেফতার মানেই শাস্তি নয়। এখন শুরু হবে প্রমাণের যুদ্ধ — সেই যুদ্ধ কতদিন চলবে, কেউ জানে না। অথচ তনুর বাবা ইয়ার হোসেন একসময় বলেছিলেন, “বিচার পাইলাম কই?” এই একটি বাক্যে দশ বছরের যন্ত্রণা আর রাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাস মিলে আছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ধর্ষণসহ নারী ও শিশু নির্যাতনের যত মামলা হয়, তার মাত্র তিন শতাংশে আসামির শাস্তি হয়। এই একটি পরিসংখ্যান বলে দেয় আমাদের বিচার ব্যবস্থার কোথায় ক্ষত। অপরাধীরা জানে — ধরা পড়লেও শাস্তি হওয়ার সম্ভাবনা নগণ্য। এই নিশ্চিন্ততাই তাদের সাহসী করে তোলে।
সরকার সম্প্রতি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে মামলার তদন্তে ১৫ দিন এবং বিচারের জন্য তিন মাস সময় নির্ধারণ করে দিয়েছে। এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, তবে শুধু আইন সংশোধনে কাজ হবে না — প্রয়োজন কঠোর বাস্তবায়ন এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতি। কারণ এ দেশে ভালো আইনের অভাব নেই, অভাব হলো আইনের নিরপেক্ষ ও সাহসী প্রয়োগের।
আজ প্রতিটি পরিবার ভয়ে থাকে। মা, বোন, স্ত্রী — কে কোথায় কার নজরে পড়ে যাবে, এই শঙ্কা এখন প্রতিটি ঘরের নিত্যসঙ্গী। যদি এই পরিস্থিতি না বদলায়, একদিন হয়তো মানুষ কন্যা সন্তান চাইতেই ভয় পাবে। সেই সমাজ কেমন হবে — যেখানে মায়ের মমতা নেই, বোনের আবদার নেই, মেয়ের হাসি নেই?
আমাদের দাবি স্পষ্ট: বিচার দ্রুত হোক, প্রকাশ্যে হোক এবং দৃষ্টান্তমূলক হোক। প্রতিটি আছিয়া, প্রতিটি রামিসা, প্রতিটি তনুর জন্য যেন ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয় — শুধু কাগজে নয়, বাস্তবে। কারণ রাষ্ট্র যখন নিজের কন্যাদের রক্ষা করতে পারে না, সেই রাষ্ট্রের মানবিক ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
লেখক:সাকিব রহমান