নিকোটিন পাউচ ও ই-সিগারেট: নিষেধাজ্ঞার পরও কর আরোপে সরকারের দ্বৈত নীতি

বাংলাদেশে নিকোটিনজাত নতুন পণ্যগুলো জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্রমশ বড় হুমকি হয়ে উঠছে। নিকোটিন পাউচ হলো ছোট টি-ব্যাগের মতো দেখতে এক ধরনের স্মোকলেস প্রোডাক্ট, যা মুখের ভিতরে রেখে ব্যবহার করা হয় এবং এতে উচ্চমাত্রায় নিকোটিন থাকে। অন্যদিকে ই-সিগারেট বা ভেপিং ডিভাইস হলো ব্যাটারিচালিত ইলেকট্রনিক ডিভাইস, যা নিকোটিনযুক্ত তরলকে গরম করে বাষ্প তৈরি করে শ্বাসের সাথে গ্রহণ করা হয়। এসব পণ্যকে অনেকে সিগারেটের চেয়ে কম ক্ষতিকর মনে করলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এগুলো বিশেষ করে যুবক ও কিশোরদের মধ্যে দ্রুত আসক্তি তৈরি করে, হার্ট, ফুসফুস ও মস্তিষ্কের ক্ষতি করে এবং দীর্ঘমেয়াদে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়।

২০২৪-২৫ সালে সরকার প্রথমে ই-সিগারেট ও ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেমের আমদানি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে। এরপর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে জারি করা ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫’-এ ই-সিগারেট, ভেপ, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট এবং নিকোটিন পাউচসহ সব উদীয়মান নিকোটিনজাত পণ্যের উৎপাদন, আমদানি, বিক্রয়, সংরক্ষণ ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। জনস্বাস্থ্যকর্মীদের দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে এই অধ্যাদেশ জারি হয়, যা তামাকমুক্ত বাংলাদেশ ২০৪০ লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়েছিল।

কিন্তু এর আগে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) বৈশ্বিক তামাক কোম্পানি ফিলিপ মরিসকে নারায়ণগঞ্জের মেঘনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনমিক জোনে নিকোটিন পাউচ উৎপাদনের কারখানা স্থাপনের অনুমোদন দেয়। এই অনুমোদন বড় বিতর্কের জন্ম দেয়। জনস্বাস্থ্য সংগঠনগুলোর আন্দোলনের পর হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করা হয় এবং আদালত সরকারি সংস্থাগুলোকে রুল জারি করে জবাব দিতে বলে। এতে কারখানা প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন উঠে এবং অনুমোদন বাতিলের দাবি জোরালো হয়।

গত সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশে উভয় পণ্যকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে যখন এই অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করার প্রক্রিয়া চলে, তখন ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার ধারাগুলো বাদ দেওয়া হয় বা সংশোধন করা হয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই সিদ্ধান্তকে তামাক কোম্পানির লবিংয়ের ফল হিসেবে দেখছেন। ফলে নিষিদ্ধ ঘোষিত পণ্যগুলো আংশিকভাবে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আসার সুযোগ তৈরি হয়।

সাম্প্রতিক ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এই দ্বৈত নীতির আরেকটি উদাহরণ স্পষ্ট করেছে। সিগারেটের দাম বিভিন্ন স্তরে বাড়ানোর পাশাপাশি প্রথমবারের মতো নিকোটিন পাউচের ওপর আলাদা করে কর আরোপ করা হয়েছে। প্রতি ১০ গ্রাম নিকোটিন পাউচের এমআরপি ৫০০ টাকা নির্ধারণ করে ৪০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক এবং আমদানিতে উচ্চ হারে শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। ই-সিগারেটসহ হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্টের ওপরও কর ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। জনস্বাস্থ্যকর্মীরা এটিকে নিষিদ্ধ পণ্যকে কার্যত বৈধতা দেওয়ার মতো পদক্ষেপ হিসেবে সমালোচনা করেছেন।

এই ধরনের পদক্ষেপ দেশের জন্য স্পষ্ট স্বার্থের সংঘাত তৈরি করছে। একদিকে জনস্বাস্থ্য রক্ষা ও তামাকমুক্ত সমাজ গড়ার লক্ষ্য, অন্যদিকে রাজস্ব আয়ের চাহিদা এবং শিল্পের চাপ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিকোটিন পাউচ ও ই-সিগারেট যুবসমাজের মধ্যে নতুন আসক্তির ফাঁদ তৈরি করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনীতির ওপরও চাপ ফেলবে। সরকারের কাছে দাবি উঠেছে, রাজস্বের চেয়ে জনস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে হবে। আদালত, সংসদ ও জনমতের চাপে বিষয়টি আরও আলোচনায় আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।

লেখক: কাজী মোহাম্মদ হাসিবুল হক, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ কর্মী।

Share This News