বিষাক্ত ফলের বাজার- জনস্বাস্থ্য ভয়াবহ হুমকিতে

লেখক: কাজী মোহাম্মদ হাসিবুল হক, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ কর্মী।

মৌসুম শুরুর আগেই বাজারে চকচকে আম ও লিচু দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এসব ফলের অধিকাংশই কৃত্রিমভাবে পাকানো হয়েছে ক্যালসিয়াম কার্বাইড (কার্বাইড), ইথোফেন বা অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক দিয়ে। অসাধু ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফার লোভে জনস্বাস্থ্য চরম ঝুঁকিতে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এসব রাসায়নিক নিয়মিত খেলে ক্যানসার, লিভার-কিডনি জটিলতা, নিউরোলজিক্যাল সমস্যাসহ মারাত্মক রোগ দেখা দিতে পারে। শিশুদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি।

ক্যালসিয়াম কার্বাইড ব্যবহারে অ্যাসিটিলিন গ্যাস উৎপন্ন হয়, যা ফল পাকায়। তবে বাণিজ্যিক কার্বাইডে আর্সেনিক ও ফসফরাসের মতো বিষাক্ত উপাদান থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব ফল খেলে পেটের সমস্যা, মুখ-নাকের জ্বালা, বমি, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা এবং দীর্ঘমেয়াদে কিডনি-লিভার ক্ষতি, ক্যানসারসহ জটিল রোগ হতে পারে। একাধিক গবেষণায় (যেমন: PMC ও অন্যান্য জার্নাল) প্রাণীদের ওপর পরীক্ষায় কার্বাইড-পাকানো ফল খাওয়ার পর কিডনির কার্যকারিতা হ্রাস, ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্য নষ্ট এবং টিস্যু ক্ষতির প্রমাণ মিলেছে। ইথোফেনও অতিরিক্ত ব্যবহারে চোখ-ত্বকের জ্বালা, শ্বাসকষ্ট এবং অন্যান্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশে আম উৎপাদনের বড় অংশ রাজশাহী অঞ্চল থেকে আসে। মৌসুমের শুরুতে অকালে ফল বাজারজাত করার প্রবণতা বেশি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্যবসায়ীদের মধ্যে কার্বাইড ব্যবহারের হার উল্লেখযোগ্য (কোনো কোনো জরিপে ৬৫% পর্যন্ত)। সরকারি অভিযান মাঝে মাঝে চললেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি।

আইনি কাঠামো ও প্রয়োগের ঘাটতি

বাংলাদেশ পিওর ফুড অর্ডিন্যান্স (সংশোধন) আইন ২০০৫ এ ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ফর্মালিনসহ ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার নিষিদ্ধ। মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯ এ অন-স্পট শাস্তির বিধান রয়েছে। প্ল্যান্ট কোয়ারেন্টাইন আইন, কনজিউমার প্রটেকশন আইনসহ একাধিক আইনে দণ্ডের ব্যবস্থা আছে, সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড বা জরিমানা। কিন্তু বাস্তবে নজরদারি অপর্যাপ্ত। হাইকোর্টসহ বিভিন্ন সময়ে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তবু অসাধু চক্র সক্রিয়। ফল সংগ্রহের নির্ধারিত ক্যালেন্ডার বাস্তবায়ন জরুরি, যাতে অপরিপক্ব ফল বাজারে না আসে।

সরকারের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত অভিযান, ল্যাব টেস্টিং বাড়ানো, বর্ডারে নজরদারি এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রাকৃতিক পাকানোর পদ্ধতি (যেমন: নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা ও ইথিলিন গ্যাসের নিরাপদ ব্যবহার) প্রচার করা দরকার। ইথিলিন গ্যাস নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় অনেক দেশে অনুমোদিত, কিন্তু কার্বাইড সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

ভোক্তাদের সচেতনতাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। মৌসুমের আগের অস্বাভাবিক চকচকে, শক্ত বা একই রঙের ফল এড়িয়ে চলুন। প্রাকৃতিকভাবে পাকা ফলে স্বাদ, গন্ধ ও পুষ্টিগুণ বেশি থাকে। ফল ধোয়া, খোসা ছাড়ানো এবং পরিমিত খাওয়া অভ্যাস করুন। শিশু ও গর্ভবতী নারীদের আরও সতর্ক থাকতে হবে।

এই বিষ বাণিজ্য বন্ধ না করলে জনস্বাস্থ্য বিপর্যয় অনিবার্য। সরকার, প্রশাসন, ব্যবসায়ী ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নিরাপদ ফলের বাজার গড়ে তোলা সম্ভব। স্বাস্থ্যই সম্পদ, এই সচেতনতা থেকে শুরু করি আজই।

Share This News