প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে আমার জীববিজ্ঞান ছিল। তখন পরীক্ষার জন্যই পড়েছি; মস্তিষ্কের বিশ্লেষণ ক্ষমতাও কম ছিল, তাই যা পড়েছি তা-ই বিশ্বাস করেছি। যেমন—জীববিজ্ঞানের পাঠ্যবই আমাকে শিখিয়েছে মানুষ ‘তৃণভোজী’ বা ‘মাংসাশী’ যা-ই হোক না কেন, সে মূলত একটি ‘সামাজিক প্রাণী’। কিন্তু আজ যখনই কোনো অঘটন ঘটে বা ক্ষমতার দম্ভে কেউ কাউকে পিষে দেয়, আমরা চিৎকার করে বলি, “ওটা কি মানুষ? ওটা তো একটা পশু!” এখানেই তৈরি হয় এক বিশাল প্রশ্ন। মানুষ কেন প্রাণী, আর অন্য প্রাণীরা কেন কেবলই ‘পশু’? বর্তমান সমাজের যা হাল, তাতে ‘পশু’ শব্দটা অন্য প্রাণীদের জন্য গালি, নাকি মানুষের জন্য পদক—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হলো বিবেক এবং নির্বাচন করার ক্ষমতা। ডারউইনের বিবর্তনবাদ থেকে শুরু করে অ্যারিস্টটলের দর্শন—সবখানেই মানুষকে ‘র্যাশনাল অ্যানিমেল’ বা ‘যুক্তিধারী প্রাণী’ হিসেবে আলাদা করা হয়েছে। পশুর জীবন পরিচালিত হয় প্রবৃত্তি দ্বারা। সে তখন খুনি নয়; সে কেবল তার ক্ষুধার জৈবিক নির্দেশ পালন করে। কিন্তু মানুষ ‘পশু’ নয়, কারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে নৈতিকতার জোয়াল। এই জোয়াল যখন খুলে পড়ে, তখনই শুরু হয় আসল সংকট।
বর্তমান সমাজে মানুষের হিংস্রতা কোনো শিকারি প্রাণীর মতো নয়, বরং তা অনেক বেশি ঠান্ডা মাথার এবং সুশৃঙ্খল। একজন মানুষ অন্যজনের গীবত করে, তাকে সামাজিকভাবে হেয় করে কিংবা যুদ্ধের নামে লাখ লাখ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। এর পেছনে কোনো জীবন রক্ষার লড়াই নেই; আছে কেবল ক্ষমতার লিপ্সা আর ‘ইগো’র লড়াই। বাঘ মানুষকে মারলে সেটা সংবাদ হয়, কিন্তু মানুষ যখন ধর্মের নামে, রাজনীতির নামে, ক্ষমতার লোভে বা স্রেফ বিনোদনের নামে মানুষ মারে, সেটা তখন ‘সভ্যতা’র অংশ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাই আজকের দিনে কোনো মানুষকে ‘পশু’ বললে আসলে পশুকুলেরই মানহানি হওয়ার কথা। আমরা মানুষকে ‘পশু’ বলি গালি হিসেবে, কিন্তু পশুরা অন্তত ভণ্ড নয়। তারা যা, তারা তা-ই। অথচ আমরা দাবি করি আমরা ‘পশু’ নই। সত্যিই তো, পশুদের এত ‘বুদ্ধি’ কোথায়!
আধুনিক সমাজে আমরা এক অদ্ভুত দ্বৈত সত্তা নিয়ে বাস করছি। আমরা বাইরে অত্যন্ত মার্জিত, রুচিশীল এবং সংস্কৃতিবান, কিন্তু আমাদের ভেতরের অরণ্যটি আরও বেশি অন্ধকার হয়ে গেছে। ‘সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট’ নীতিটি এখন মানুষের কোনো জৈবিক প্রয়োজনে নয়, বরং আধিপত্যবাদের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে।
মানুষকে কেন পশু বলা হবে না? কারণ, পশু হওয়ার যোগ্যতাও সম্ভবত আমরা হারিয়েছি। পশুরা প্রকৃতির নিয়মে চলে, আর মানুষ চলে নিজের তৈরি করা কৃত্রিম অহংকারের নিয়মে। সভ্যতার নামে আমরা যে আদিম উল্লাসে মেতেছি, তাতে ‘প্রাণী’ হিসেবে আমাদের পরিচয় থাকলেও ‘মানুষ’ হিসেবে আমাদের অস্তিত্ব আজ প্রশ্নবিদ্ধ।
যদি বিবেকহীনতাই আমাদের ভূষণ হয়, তবে অন্য প্রাণীদের ‘পশু’ বলে গালি দেওয়া বন্ধ করা উচিত। কারণ দিনশেষে, একটি পশু কেবল তখনই মারমুখী হয় যখন সে নিরুপায়; আর মানুষ তখনই মারমুখী হয় যখন সে অপরিমেয় ক্ষমতার অধিকারী হতে চায়। মানুষ হওয়ার যে গুরুভার প্রকৃতি আমাদের দিয়েছিল, আমরা কি আদৌ তার যোগ্য হতে পেরেছি?
লেখক: মোস্তফা জামাল পপলু, বিশেষ প্রতিনিধি মাছরাঙা টেলিভিশন।