নিজেদের কোনো উৎপাদন নেই, অথচ মরণনেশার ভয়াল স্রোতে ভাসছে পুরো দেশ। দেশে বর্তমানে মাদকসেবীর সংখ্যা প্রায় ৮২ লাখ। আন্তর্জাতিক চোরাকারবারিদের প্রধান ট্রানজিট ও টার্গেট এখন বাংলাদেশ। ভারতের সাথে ৪,১৫৬ কিলোমিটার এবং মিয়ানমারের সাথে ২৭১ কিলোমিটারের দীর্ঘ সীমান্তকে হাতিয়ার করে দেশের অন্তত ১৮টি জেলার ১০৫টি অরক্ষিত ও চিহ্নিত পয়েন্ট দিয়ে অহরহ ঢুকছে ইয়াবা, হেরোইন, আইস থেকে শুরু করে সর্বনাশা এলএসডি।
দৈনিক ডেইলি স্টারের এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের প্রথম পর্বে উঠে এসেছে মাদক চোরাচালানের এই ভয়াবহ রুট, পাচারকারীদের অভিনব কৌশল এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চ্যালেঞ্জের বাস্তব চিত্র।
১. সীমান্তজুড়ে মাদকের রুট: কোন পথে কী আসছে?
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের চারপাশের সীমান্ত অঞ্চলগুলোকে ভাগ করে একেক দিক দিয়ে একেক ধরনের মাদক ঢোকাচ্ছে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সিন্ডিকেট:
- দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত (মিয়ানমার রুট): কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া, শাহপরীর দ্বীপ, ঘুমধুম, তুমব্রু, কুতুপালং এবং সেন্ট মার্টিন দ্বীপ—এই পয়েন্টগুলো এখন ইয়াবা ও ভয়ংকর ক্রিস্টাল মেথ (আইস) পাচারের প্রধান হটস্পট। রোহিঙ্গা ক্যুরিয়ারদের মাধ্যমে মূলত এই মাদকের ঢল নামছে।
- পশ্চিম ও পূর্ব সীমান্ত (ভারত রুট): যশোর, সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা এবং ফেনী। এই রুট দিয়ে মূলত আসছে ফেনসিডিল, গাঁজা এবং হেরোইন।
- উত্তরাঞ্চলীয় রুট: কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, শেরপুর, ময়মনসিংহ এবং নেত্রকোনার সীমান্ত পয়েন্টগুলোকেও রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (DNC) ঢাকা বিভাগের অতিরিক্ত মহাপরিচালক এ কে এম শওকত ইসলাম জানান, দেশে আটক হওয়া মাদকের মধ্যে এখন ইয়াবার পরিমাণই সবচেয়ে বেশি। এর প্রায় ৮০ শতাংশই দেশের ভেতরে ভোগ করা হয়, আর বাকি অংশ বিমানবন্দর ও ক্যুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ছোট চালানে বিদেশে পাচার হয়ে যায়। তবে কোকেনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মূলত একটি ‘ট্রানজিট রুট’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যার মূল গন্তব্য থাকে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত।
২. গডফাদারদের প্রধান টার্গেট রাজধানী ঢাকা
দেশের ৮২ লাখ মাদকসেবীর মধ্যে প্রায় ২৩ লাখেরই অবস্থান রাজধানী ঢাকায়। কিন্তু কেন ঢাকাই চোরাকারবারিদের প্রধান গন্তব্য?
ডিএনসি কর্মকর্তাদের মতে, আন্তর্জাতিক চোরাচালানের একটি সহজ সূত্র হলো—যেখানে জনসংখ্যা ও নগদ টাকার প্রবাহ (Cash Flow) বেশি, সেখানেই মাদকের বাজার সবচেয়ে বড়। ঢাকার অভিজাত ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে মাদকের চাহিদা এবং টাকা—দুটোরই কোনো ঘাটতি নেই।
৩. বদলে গেছে পাচারের কৌশল: ভয়ংকর উত্থান সিন্থেটিক ড্রাগের
মাদক পাচারকারীরা এখন আর শুধু পুরনো পদ্ধতিতে সীমাবদ্ধ নেই। তারা আধুনিক প্রযুক্তির পূর্ণ ব্যবহার করছে:
- ডিজিটাল লেনদেন ও গোপন অ্যাপ: হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকের গোপন গ্রুপে কোড নামের মাধ্যমে চলছে কেনাবেচা। লেনদেন হচ্ছে ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমে।
- ক্যুরিয়ার ও মানবদেহ: পেটের ভেতর ইয়াবা গিলে বহন করা, জুতোর সোল, হাঁটার লাঠি এবং গাড়ির টায়ারে লুকিয়ে মাদক আনা হচ্ছে। নারী ও শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে নিরাপদ ‘ক্যুরিয়ার’ হিসেবে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো ল্যাবরেটরিতে তৈরি সিন্থেটিক ও সাইকোঅ্যাকটিভ ড্রাগ (যেমন: LSD এবং MDMA বা এক্সট্যাসি)-এর ভয়াবহ বিস্তার। এই মাদকগুলো সরাসরি মানুষের মস্তিষ্ক ও আচরণ বদলে দেয়। ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীরাই এই আধুনিক মাদকের প্রধান ক্রেতা ও বাহক।
| মাদকের ধরন | ২০২৪ সালের জব্দকৃত পরিমাণ | ২০২৫ সালের জব্দকৃত পরিমাণ | পরিস্থিতির চিত্র |
| ইয়াবা ও এটিএস ট্যাবলেট | ২ কোটি ২৮ লাখ পিস | ৪ কোটি ৩৫ লাখ পিস | প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে |
| হেরোইন | ৫০৩ কেজি | ৩৩৭ কেজি | কিছুটা কমেছে |
| ফেনসিডিল | ৫,৭২,৮৬৫ বোতল | ৩,১৯,৯৪০ বোতল | কিছুটা কমেছে |
| গাঁজা | ১,১৪,৩৪৫ কেজি | ৯৬,৩৫৮ কেজি | কিছুটা কমেছে |
| কোকেন | ১৩০ কেজি | ১৫ কেজি | উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে |
৪. মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও প্রভাবশালীদের ছায়া
কক্সবাজার এবং যশোরের মতো প্রধান দুটি প্রবেশদ্বারের পুলিশ সুপারদের (SP) বক্তব্যে উঠে এসেছে মাঠপর্যায়ের কঠিন বাস্তবতা:
“ইয়াবা গডফাদার আবদুর রহমান বদির নেটওয়ার্ক পতনের পর এখানে নতুন কোনো বড় গডফাদারের উত্থান ঘটেনি, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি বড় সাফল্য। তবে যে হারে মাদক ঢুকছে, তাতে স্পষ্ট যে সীমান্তের কোথাও না কোথাও নিরাপত্তায় ফাঁকফোকর রয়েছে। আমাদের সীমিত জনবল ও সম্পদ নিয়ে এই বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে।”
— এ এন এম সাজেদুর রহমান, পুলিশ সুপার, কক্সবাজার।
যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম স্বীকার করেন যে, স্থানীয় অপরাধী চক্রের সাথে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশ থাকায় এই অপরাধ দমন অত্যন্ত জটিল। তার ভাষায়, “মাদক ব্যবসায়ীরা প্রায়ই বিভিন্ন মহল থেকে আশ্রয় ও প্রশ্রয় পায়। কখনো অসাধু ব্যক্তি, কখনো স্থানীয় প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক মহলের ছাতায় তারা পার পেয়ে যায়, যা চিহ্নিত করা কঠিন।”
৫. সমাধানের পথ: ‘পয়েন্ট জানা থাকলে মাদক থামছে না কেন?’
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আশরাফুল হুদা পুরো পরিস্থিতির একটি তীক্ষ্ণ ও বাস্তবমুখী বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। তিনি সোজাসাপ্টা প্রশ্ন তোলেন:
“আমরা যদি জানি যে কোন কোন পয়েন্ট দিয়ে মাদক আসছে, তাহলে সেগুলো বন্ধ হচ্ছে না কেন?”
তার মতে, এই ব্যর্থতার পেছনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যের গাফিলতি ও দুর্নীতি দায়ী। মাদকের অবৈধ বাণিজ্যে ওড়ে বিপুল পরিমাণ কালো টাকা, যা দিয়ে সহজেই অনেককে কিনে ফেলা হয়। এই সংকট উত্তরণে তিনি তিনটি নির্দিষ্ট সুপারিশ করেন:
১. চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি ও কঠোর পাহারা বহুগুণ বাড়ানো।
২. সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ওপর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা।
৩. বাহিনীতে ‘পুরস্কার ও শাস্তি’ (Reward and Punishment) ব্যবস্থা কার্যকর করা—ভালো কাজের জন্য পুরস্কার এবং অপরাধে যুক্তদের তাৎক্ষণিক কঠোর শাস্তির আওতায় আনা।
৬. নতুন আইন ও ডিএনসি’র নতুন প্রস্তুতি
জনবল, আধুনিক সরঞ্জাম ও গোয়েন্দা সক্ষমতার অভাবে দীর্ঘদিন ধরেই ধুঁকছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (DNC)। এর ওপর মামলার দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তের দুর্বলতা এবং সাক্ষীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের কারণে বছরের পর বছর আদালতে ঝুলে থাকে হাজারো মামলা।
তবে আশার আলো দেখাচ্ছে চলতি বছরের ১৬ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন, ২০২৬’। ডিএনসি’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, নতুন এই আইনের ফলে তাদের সক্ষমতা অনেকটাই বাড়বে:
- নিজস্ব সাইবার ইউনিট ও ডগ স্কোয়াড গঠনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
- বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ডিএনসি’র সরাসরি ও বিস্তৃত অভিযান চালানোর ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
- নারী ও শিশু নির্যাতন দমন সেলের মতো এখন থেকে দেশের প্রতিটি থানায় মাদক মামলা পরিচালনার জন্য ‘বিশেষায়িত ডেস্ক’ বা আলাদা সেল থাকবে।
মাদক চোরাচালানের এই সর্বগ্রাসী থাবা থেকে দেশের তরুণ প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে এখন প্রয়োজন সীমান্তের ছিদ্রে অবিলম্বে তালা লাগানো এবং প্রভাবশালী গডফাদারদের আইনের কঠোরতম শাস্তির মুখোমুখি করা।
Source :thedailystar