বামনা (বরগুনা) প্রতিনিধি:
বরগুনার বামনা উপজেলায় তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকর বাস্তবায়নে সমন্বিত ও স্থায়িত্বশীল উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সোমবার (১৩ এপ্রিল) সকাল ১১টায় উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোট ও ম্যান ফর ম্যান (মানুষ মানুষের জন্য)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক জরুরি আলোচনা সভায় এ আহ্বান জানানো হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও টাস্কফোর্স কমিটির সভাপতি মোসা: নিকহাত আরা।

সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বরগুনা-২ আসনের চিফ হুইপের প্রতিনিধি মো. আলহাজ্ব রুহুল আমিন শরীফ। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন উপজেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার আবুল কালাম আজাদ (রানা), উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ও টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য সচিব ডা. মো. মনিরুজ্জামান, বামনা থানার অফিসার ইনচার্জ মো. ফারুক হোসেন এবং ডা. মো. ফেরদৌস হোসেন। এছাড়া স্থানীয় সাংবাদিক নাসির উদ্দিন মোল্লা, মাসুদ রেজা ফয়সালসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি, কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও বুদ্ধিজীবীরা সভায় অংশগ্রহণ করেন।
সভায় ম্যান ফর ম্যান-এর নির্বাহী পরিচালক, উপজেলা টাস্কফোর্স সদস্য ও বামনা প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এম এ মতিন আকন্দ তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নের বর্তমান অবস্থা ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। তিনি জানান, বরগুনা জেলায় সাম্প্রতিক মূল্যায়নে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নের গড় প্রাপ্তি মাত্র ৩৩ শতাংশ, যা নিম্ন-মধ্যম হলেও ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতা নির্দেশ করে। মাঠপর্যায়ের সরাসরি পর্যবেক্ষণে এ হার আরও কমে ২১ শতাংশে নেমে এসেছে, যা বাস্তবায়নের দুর্বল চিত্র স্পষ্ট করে।
সূচকভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মনিটরিং ব্যবস্থায় প্রাপ্তি মাত্র ২৫ শতাংশ, যা অত্যন্ত অসন্তোষজনক। পরোক্ষ ধূমপান থেকে সুরক্ষায় ৫০ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য সতর্কীকরণে ৭৫ শতাংশ প্রাপ্তি কিছুটা আশাব্যঞ্জক হলেও বিজ্ঞাপন, প্রচারণা ও পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ন্ত্রণে প্রাপ্তি ৪২ শতাংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থা কর বৃদ্ধির ক্ষেত্রে, যেখানে প্রাপ্তি মাত্র ৮ শতাংশ—যা সরাসরি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার ইঙ্গিত দেয়।

সরকারি ও বেসরকারি মূল্যায়নের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়েছে। সরকারি টাস্কফোর্স সদস্যদের মতে জেলার গড় প্রাপ্তি ৩৭ শতাংশ, যেখানে স্বাস্থ্য সতর্কীকরণে ১০০ শতাংশ এবং বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণে ৮৩ শতাংশ অগ্রগতি দেখানো হয়েছে; তবে কর বৃদ্ধিতে প্রাপ্তি শূন্য শতাংশ। অন্যদিকে বেসরকারি মূল্যায়নে গড় প্রাপ্তি ৩৩ শতাংশ; মনিটরিংয়ে ১৭ শতাংশ, বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণে ৩৩ শতাংশ এবং কর বৃদ্ধিতে ১৭ শতাংশ প্রাপ্তি পাওয়া গেছে। এই পার্থক্য সমন্বয় ও জবাবদিহিতার ঘাটতির দিকটি স্পষ্ট করে।
মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র আরও উদ্বেগজনক। সেখানে গড় প্রাপ্তি মাত্র ২১ শতাংশ। মনিটরিং ৩০ শতাংশ, পরোক্ষ ধূমপান সুরক্ষা ৪০ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য সতর্কীকরণ ৬৫ শতাংশ হলেও বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধকরণ ও কর বাস্তবায়ন—উভয় ক্ষেত্রেই প্রাপ্তি মাত্র ৪ শতাংশ, যা কার্যত বাস্তবায়ন ভেঙে পড়ার ইঙ্গিত দেয়।
জাতীয় পর্যায়ের চিত্রও একই ধরনের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে। বিভিন্ন জেলার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ জেলায় টাস্কফোর্স সভা নিয়মিত হয় না, জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলে প্রতিবেদন প্রেরণ অনিয়মিত এবং তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন এখনও দৃশ্যমান। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাক বিক্রিও অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি ব্যবহারকারীদের নির্ভরযোগ্য তথ্য ও কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থার ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সভায় বক্তারা বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জনে নিয়মিত টাস্কফোর্স সভা নিশ্চিত করা, মোবাইল কোর্ট ও ভ্রাম্যমাণ অভিযান জোরদার করা, তামাক বিজ্ঞাপন ও পৃষ্ঠপোষকতার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ এবং কর কাঠামোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া ই-সিগারেট নিষিদ্ধকরণ, তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণ এবং বিকল্প হিসেবে খাদ্য ফসল উৎপাদনে উৎসাহ প্রদানেও গুরুত্বারোপ করা হয়।
সভায় উপস্থিত বক্তারা তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর জোর দেন এবং কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়নের দাবি জানান।