উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের পেশাগত ও মৌলিক দক্ষতা বাড়াতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। অথচ, সেই প্রশিক্ষণে অংশ নিতেই অনীহা দেখা যাচ্ছে স্বয়ং কর্মকর্তাদের মধ্যে! কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে এক চমকপ্রদ তথ্য—প্রশিক্ষণের সাথে ‘বিদেশ ভ্রমণ’-এর সুযোগ না থাকায় তাতে আগ্রহ হারাচ্ছেন তারা।
প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগটি এখন আমলাতান্ত্রিক অনীহা আর সমন্বয়হীনতার কারণে মাঝপথেই ধুঁকছে।
প্রকল্পের বর্তমান চিত্র: বরাদ্দের বিপরীতে হতাশাজনক অগ্রগতি
উপসচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার ৫০০ জন কর্মকর্তার মৌলিক দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে ২০১৯ সালে একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়।
- মোট বাজেট: ৪৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা।
- সময়ের হিসাব: চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের সংশোধিত মেয়াদ বাড়ানো হলেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।
- বাস্তব অগ্রগতি: প্রকল্পের মেয়াদ শেষের দিকে এসেও আর্থিক খরচ হয়েছে মাত্র ৪৮ শতাংশ এবং বাস্তব অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৬৬ শতাংশে।
কেন মিলছে না প্রশিক্ষণার্থী? বিয়াম ফাউন্ডেশনের অভিজ্ঞতা
প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী সংস্থা বিয়াম ফাউন্ডেশন-এর সাম্প্রতিক একটি অভিজ্ঞতা এই সংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। সবশেষ নির্ধারিত সময়ে দুটি ব্যাচে মোট ৫০ জন কর্মকর্তার প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় আবেদনের অভাবে শেষ পর্যন্ত মাত্র ১৮ জনকে নিয়েই প্রশিক্ষণ শুরু করতে বাধ্য হয় সংস্থাটি।
বিয়াম ফাউন্ডেশনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তার মতে, পুরো প্রক্রিয়াটিই আটকে আছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নথিপত্রের দীর্ঘসূত্রিতায়:
“জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকেই মূলত বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। তারা আমাদের যে কয়জন অংশগ্রহণকারী দিয়েছে, আমরা তাদের নিয়েই কাজ করেছি। মন্ত্রণালয়ের ফাইল এখনও সেভাবেই পড়ে আছে, কোনো নড়চড় হয়নি।”
আসল কারণ: ‘বিদেশ ভ্রমণ’ বন্ধ বনাম দেশীয় প্রশিক্ষণে অনীহা
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের ওপর বিধি-নিষেধ বা তা স্থগিত থাকায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রশিক্ষণের সাথে বিদেশ সফরের সুযোগ থাকলে কর্মকর্তাদের মাঝে যে উৎসাহ দেখা যায়, দেশীয় প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে তার ছিটেফোঁটাও নেই।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মো. ফিরোজ মিয়া বেশ খোলামেলা ও বাস্তবধর্মী মতামত দিয়েছেন। তিনি এই পরিস্থিতির জন্য কর্মকর্তাদের মানসিকতার পাশাপাশি সরকারের নজরদারির অভাবকেও দায়ী করেছেন:
“প্রশিক্ষণটি যদি বিদেশে হয়, তখন কে আগে যাবে বা কাকে বাদ দিয়ে কে যাবে—তা নিয়ে জোর তদবির শুরু হয়ে যায়। কিন্তু সেটি যখন দেশের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন আর কর্মকর্তা খুঁজে পাওয়া যায় না। এক্ষেত্রে সরকারেরও গাফিলতি রয়েছে। সরকার যদি কঠোর অবস্থানে যায় এবং মনোনয়ন দেওয়ার পরও কেউ অংশ না নিলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়, তাহলে কর্মকর্তারা আসতে বাধ্য।”
পরবর্তী পদক্ষেপ: বাধ্যতামূলকের পথে হাঁটছে সরকার
পরিকল্পনামাফিক প্রশিক্ষণার্থী না পাওয়ায় নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্প শেষ করতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। এই সংকট কাটাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এখন দ্বিমুখী কৌশল হাতে নিচ্ছে:
- মেয়াদ বৃদ্ধি: অসমাপ্ত প্রকল্পটি সম্পন্ন করতে আরও দুই বছর মেয়াদ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
- বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণ: দেশীয় প্রশিক্ষণে কর্মকর্তাদের এই অনীহা কাটাতে ভবিষ্যৎ পদোন্নতি বা কর্মমূল্যায়নের সাথে যুক্ত করে এই প্রশিক্ষণকে বাধ্যতামূলক করার বিষয়েও চিন্তা-ভাবনা চলছে।
একদিকে দেশীয় প্রশিক্ষণে কর্মকর্তাদের চরম অনীহা, অন্যদিকে বিদেশ প্রশিক্ষণ স্থগিত—এই দুই সংকটের যাঁতাকলে পড়ে প্রশাসনের প্রকৃত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য এখন নতুন ও কার্যকর পথের সন্ধানে রয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।