কোটি টাকা ব্যয়েও ফিরছে না খুলনার ময়ূর নদের প্রাণ, আংশিক খননে সুফল নিয়ে সংশয়

অনলাইন ডেস্ক | নগরের খবর

খুলনা: খুলনার প্রাণকেন্দ্র দিয়ে বয়ে যাওয়া একসময়ের খরস্রোতা ময়ূর নদ আজ যেন মৃতপ্রায় খালে পরিণত হয়েছে। নগরের জলাবদ্ধতা নিরসন ও নদের নাব্য ফেরাতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে একাধিক প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও অপরিকল্পিত ও আংশিক খননের কারণে সুফল পাওয়া নিয়ে চরম সংশয় দেখা দিয়েছে। পরিবেশবিদদের মতে, ২১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদের মাত্র ৬ কিলোমিটার খনন করা হলে পুরো অর্থই জলে যাবে, কারণ পানির স্রোত তৈরি না হলে এটি আবারও ময়লা-আবর্জনায় ভরে যাবে।

এক নজরে ময়ূর নদ খনন চিত্র

  • নদের মোট দৈর্ঘ্য: ২১ কিলোমিটার (যার ৫০-৬০ শতাংশ নগরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত)।
  • অতীতের খনন ব্যয়: দুই দফায় ১৩ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।
  • চলমান প্রকল্প: ৮২৩ কোটি টাকার প্রকল্প চলমান।
  • দূষণের মূল কারণ: শহরের ২২টির বেশি গুরুত্বপূর্ণ নালার মুখ সরাসরি নদে যুক্ত।

আংশিক খনন ও অর্থের অপচয় নিয়ে শঙ্কা

পরিবেশসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সঠিক সিদ্ধান্তের অভাব, খননে অনিয়ম, দখল এবং অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে ময়ূর নদের প্রাণ ফেরানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল জানান, “যেভাবে ময়ূর নদ খনন হচ্ছে, তা কতটুকু কাজে আসবে তা নিয়ে আমরা সন্দিহান। সুফল পেতে ময়ূর নদ এবং এর সংযুক্ত খালগুলো একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় খনন করতে হবে।”

কেসিসি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও সাম্প্রতিক উদ্যোগ

খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) কর্তৃপক্ষের মতে, রূপসা সেতুর কারণে রূপসা ও ভৈরব নদের নাব্য এমনভাবে কমেছে যে শহর তুলনামূলক নিচু হয়ে গেছে। ফলে জোয়ারের সময় বৃষ্টি হলে পানি নামার বদলে শহরে উল্টো জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এ কারণে স্থায়ী সমাধানে ময়ূর নদের আংশিক নয়, বরং পুরো ২১ কিলোমিটার এবং আশপাশের ক্ষুদের খালসহ অন্যান্য সংযোগ খালগুলোও সংস্কার করা প্রয়োজন।

কেসিসির প্রধান প্রকৌশলী মশিউজ্জামান জানান, গত প্রায় দু’বছর ধরে ময়ূর নদের ৫.৯১ কিলোমিটারজুড়ে (বয়রা শ্মশানঘাট থেকে বটিয়াঘাটার সাচিবুনিয়া পর্যন্ত) খনন কাজ চালানো হয়েছে। ৬৫ থেকে ১৪১ ফুট চওড়া এবং ৬ থেকে ৮ ফুট গভীর করে কাটা এই অংশের জন্য ব্যয় হয়েছে ৭ কোটি টাকার বেশি। মূলত নগরের পানি নিষ্কাশনের জন্যই এই খনন পরিকল্পনা নেওয়া হয়।

কীভাবে মৃত্যু হলো ময়ূর নদের?

খুলনা নগরীর পশ্চিম পাশ দিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত এই নদ একসময় ভৈরব নদের একটি স্রোতোধারা ছিল, যা শহরের মিঠাপানির অন্যতম উৎস হিসেবে বিবেচিত হতো। স্থানীয়দের মতে, দখল ও অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি আশির দশকে পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক রূপসার আলুতলায় ১০ ভেন্টের একটি জলকপাট (স্লুইস গেট) নির্মাণই ছিল নদটির মৃত্যুর মূল কারণ। মূলধারার পানির চাপ সামলাতে না পেরে সেই সময় থেকেই নদের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং নাব্য হারাতে থাকে।

বর্তমানে শহরের অধিকাংশ পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা এই নদের সঙ্গে যুক্ত থাকায় তলদেশে ময়লার স্তূপ জমে নদটি তার অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া খুলনার হৃৎপিণ্ডখ্যাত এই নদের প্রাণ ফেরানো প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Share This News