যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মাত্র মাসখানেক আগে হওয়া শান্তি সমঝোতা এখন অতীত। দুই দেশের অব্যাহত পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে আবারও একটি ভয়াবহ ও সর্বাত্মক যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব—উভয় পক্ষই গত মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (MOU) আর না মানার ঘোষণা দেওয়ায় পরিস্থিতি এখন খাদের কিনারায়।
ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি আর মাত্র দুই-তিন দিন এভাবে হামলা অব্যাহত রাখে, তবে তেহরান পুরো অঞ্চলে ‘সর্বাত্মক অভিযান’ শুরু করতে বাধ্য হবে।
১. সমঝোতার অপমৃত্যু ও নতুন হুশিয়ারি
গত ১৭ জুন কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল, তা এখন পুরোপুরি অকার্যকর। ২২ জুন সুইজারল্যান্ডে দুই দেশের আলোচনার পর থেকেই মূলত নতুন করে সংঘাতের সূত্রপাত।
- ট্রাম্পের অবস্থান: প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আগেই স্পষ্ট করেছেন, ইরান শর্ত না মানলে তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।
- ইরানের জবাব: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এক কঠোর বিবৃতিতে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বারবার চুক্তি লঙ্ঘনের ঘটনাই প্রমাণ করে মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর সম্পূর্ণ “মূল্যহীন ও অকার্যকর।”
- সর্বাত্মক যুদ্ধের আল্টিমেটাম: ইরানের জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, মার্কিন হামলা আর ২-৩ দিন চললে ইরান আর কোনো বাঁধ মানবে না; শুরু হবে পুরোদমে যুদ্ধ।
২. যুক্তরাষ্ট্রের লাগাতার হামলা ও বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) টানা সপ্তম দিনের মতো ইরানে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। আগে কেবল সামরিক স্থাপনা টার্গেট করা হলেও, এখন হামলায় যুক্ত হয়েছে বেসামরিক অবকাঠামো।
- টার্গেটে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা: বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, সেতু, সুড়ঙ্গ এবং ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভান্ডারে আঘাত হানছে মার্কিন বাহিনী।
- যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ বিপর্যয়: হরমোজগান প্রদেশে অন্তত ১১৬টি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার অচল হয়ে পড়েছে। খুজেস্তান প্রদেশের ১২টি শহরের ৯৫টি স্থানে হামলায় পানি শোধনাগার ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বহু গ্রামে সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে।
- হতাহত: ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৬ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এই নতুন দফায় অন্তত ৫০ জন নিহত এবং ৫০০-এর বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
৩. পাল্টা মার ইরানের: রণক্ষেত্রে পুরো মধ্যপ্রাচ্য
যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা হামলার জবাবে বসে নেই তেহরানও। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের যেসব দেশে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রয়েছে, সেখানেই পাল্টা আঘাত হানছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।
- জর্ডান: আল-আজরাক ঘাঁটির জ্বালানি ট্যাংকে ইরানের হামলায় ২ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে এ নিয়ে মোট ১৬ জন মার্কিন সেনাসদস্য প্রাণ হারালেন।
- সৌদি আরব: প্রায় তিন মাস পর আবারও সৌদি আরবে হামলা চালিয়েছে ইরান। রিয়াদের কাছে মার্কিন সেনাসমৃদ্ধ আল-খারজের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি এবং লোহিত সাগরের ইয়ানবু উপকূলে সতর্কসংকেত বাজানো হয়েছে।
- কুয়েত ও বাহরাইন: কুয়েতের একটি তেল স্থাপনা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে আঘাত হেনেছে ইরান, যার ফলে কয়েকটি উৎপাদন ইউনিট বন্ধ হয়ে গেছে। বাহরাইনে মার্কিন ব্যবহৃত শেখ ইসা বিমানঘাঁটির হ্যাঙ্গার ও জ্বালানি সংরক্ষণাগারেও হামলা চালানো হয়েছে।
৪. বিশ্লেষকদের উদ্বেগ: আইনের অনুশাসনহীন এক সংঘাত
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ এখন আর কেবল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে গ্রাস করছে।
কাতারভিত্তিক আরব পারস্পেকটিভস ইনস্টিটিউটের পরিচালক জেইদন আলকিনানি পরিস্থিতিকে “অত্যন্ত উদ্বেগজনক” বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এই সংঘাতের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—আন্তর্জাতিক আইনের চরম ব্যর্থতা এবং যুদ্ধ থামাতে জাতিসংঘ বা বিশ্ব মোড়লদের কার্যকর কোনো উদ্যোগের অনুপস্থিতি। কূটনৈতিক সমাধানের রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি।