২৭ জুন ২০২৬
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো চীন সফর শেষ করেছেন তারেক রহমান। তিন দিনের এই রাষ্ট্রীয় সফর শেষে বাংলাদেশ ও চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। সফর শেষে দুই দেশের পক্ষ থেকে ১৪ দফার একটি যৌথ ইশতেহার প্রকাশ করা হয়েছে, পাশাপাশি চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও আলাদা একটি বিবৃতি দেওয়া হয়েছে।
সফরের শেষ দিনে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে সি চিন পিং বলেন, বিশ্ব পরিস্থিতি যেমনই হোক, চীন বাংলাদেশের পাশে একজন বিশ্বাসযোগ্য বন্ধু, সুপ্রতিবেশী ও অংশীদার হিসেবে থাকবে। তিনি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রতিরোধে দেশটির অবস্থানের প্রতি চীনের সমর্থন অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে নতুন সরকারকে শাসনকার্যে সহযোগিতা এবং অঞ্চল ও পথের উদ্যোগ (বিআরআই)-এ যুক্ত সহযোগিতা আরও এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।
এর আগে সকালে তিয়েনআনমেন স্কয়ারে চীনের শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী। পরে চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাউ লেজির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন তিনি। সফরের শেষ কর্মসূচি ছিল চীনের কমিউনিস্ট পার্টির জাদুঘর পরিদর্শন, এরপর তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন।
আলোচনায় বিশেষভাবে গুরুত্ব পায় চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাব—একটি রুট যা চীনের কুনমিং থেকে মিয়ানমারের মান্দালয় ও রাখাইন হয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। নব্বইয়ের দশকে ভারতকে নিয়ে প্রস্তাবিত পুরোনো বিসিআইএম উদ্যোগ ভারতের আপত্তির কারণে এগোয়নি, তাই এবার ভারতকে বাদ দিয়ে ত্রিদেশীয় ভিত্তিতে এই করিডর এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে চীন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই করিডর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সড়ক, রেলপথ, বন্দর ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনা বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে এবং চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ সহজ হতে পারে।
বিনিময়ে বাংলাদেশ এক-চীন নীতির প্রতি তার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে—তাইওয়ানকে চীনের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি ও জাতিসংঘের ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন বহাল রেখে। এর পরিবর্তে চীন বাণিজ্য, পরিবহন, কৃষি, প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য—এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
সফর থেকে বাংলাদেশের প্রাপ্তি/অর্জনসমূহ
- সম্পর্কের মান উন্নয়ন — বাংলাদেশ ও চীন তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন, উচ্চতর স্তরে উন্নীত করতে সম্মত হয়েছে; এই লক্ষ্যে ১৪ দফার একটি যৌথ ইশতেহার প্রকাশ করা হয়েছে।
- সার্বভৌমত্বে সমর্থনের পুনর্ব্যক্তি — চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতার প্রতি সংহতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
- নতুন সরকারকে সমর্থন — চীন নতুন নির্বাচিত সরকারকে শাসনকার্য পরিচালনায় সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
- অর্থনৈতিক করিডর প্রস্তাব পুনরুজ্জীবন — চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাব নতুন করে আলোচনায় এসেছে, যা বাংলাদেশের বাণিজ্য রুট ও আঞ্চলিক সংযোগ বাড়াতে পারে (এটি এখনো প্রস্তাব পর্যায়ে, চূড়ান্ত স্বাক্ষরিত প্রকল্প নয়)।
- চট্টগ্রাম বন্দরে আগ্রহ — চট্টগ্রাম বন্দর আধুনিকায়ন করে একে আঞ্চলিক কেন্দ্রে রূপান্তরে সহায়তার আগ্রহ দেখিয়েছে চীন।
- মোংলা বন্দরে আগ্রহ — মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও উন্নয়নে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন।
- তিস্তা প্রকল্পে সহায়তা — তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে নিজ সক্ষমতা অনুযায়ী সহায়তা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে যুক্ত হতে সম্মত হয়েছে চীন।
- বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা — রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে বাণিজ্য, ই-কমার্স, শিল্প-সরবরাহব্যবস্থা ও বিনিয়োগ খাতে সহযোগিতা জোরদারের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
- শূন্য শুল্ক সুবিধা বহাল — চীনের দেওয়া ১০০ শতাংশ শূন্য শুল্ক সুবিধার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে, যা চীনা বিনিয়োগের পথ আরও সহজ করতে পারে।
- মোংলা ও চট্টগ্রাম প্রকল্পে অগ্রগতির সিদ্ধান্ত — মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন-সম্প্রসারণ এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল প্রকল্প যৌথভাবে এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে দুই পক্ষ।
- ব্রিকস ও এসসিও সদস্যপদে সমর্থন — ব্রিকসে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার পার্টনার হওয়ার আবেদনে সমর্থন জানিয়েছে চীন।
- নতুন সংলাপ ব্যবস্থা — পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে কৌশলগত সংলাপ চালু এবং কূটনীতি-প্রতিরক্ষা বিষয়ে ২+২ সংলাপের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে সম্মত হয়েছে দুই দেশ।
- স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা — বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা আধুনিকায়নে সহায়তা এবং চিকিৎসার জন্য চীনে যাওয়া বাংলাদেশিদের ভিসাপ্রক্রিয়া সহজ করার আগ্রহ দেখিয়েছে চীন।
- সহযোগিতার পরিধি বিস্তৃতি — রাজনীতি (দলীয় যোগাযোগ), বিআরআই বাস্তবায়ন, কৃষি, প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি ও শিক্ষা—এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণে সম্মত হয়েছে দুই দেশ।
লক্ষণীয়: এর মধ্যে অর্থনৈতিক করিডর এবং দুটি বন্দর আধুনিকায়নের প্রস্তাব এখনো চূড়ান্ত অর্থায়ন বা সময়সীমা নির্ধারিত কোনো চুক্তি নয়—এগুলো আগ্রহ ও সম্মতির প্রকাশ। বাস্তবায়ন নির্ভর করবে পরবর্তী আলোচনার ওপর।