ইজিবাইকের লাগামহীন ভাড়া—নিয়ন্ত্রক কে, আর বলির পাঁঠা কেন সাধারণ মানুষ?

নিজস্ব প্রতিবেদক | খুলনা

শহরের রাস্তায় বের হলেই এখন সবচেয়ে পরিচিত এবং সহজলভ্য বাহন ইজিবাইক বা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। কিন্তু এই বাহনটিতে উঠলেই যাত্রীদের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়ায় চালকদের সাথে তর্কবিতর্ক আর হতাশার। কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ করে ৫-১০ টাকা ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক—এই ভাড়া আসলে কে বাড়ায়? ইজিবাইক মালিক সমিতি কার কাছ থেকে অনুমতি নেয়? আর দিন শেষে কেন সাধারণ মানুষকেই এই ভোগান্তির নীরব শিকার হতে হয়?

অনুসন্ধান ও বাস্তবতার নিরিখে ইজিবাইক খাতের এই নৈরাজ্যের পেছনের কারণগুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো।

ভাড়া কে বাড়ায় এবং কার অনুমতিক্রমে?

কাগজে-কলমে যেকোনো গণপরিবহনের রুট এবং ভাড়া নির্ধারণ করার কথা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং স্থানীয় ‘আঞ্চলিক পরিবহন কমিটি’ (আরটিসি)-এর। শহর এলাকায় সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভাগুলো ইজিবাইকের ট্রেড লাইসেন্স বা রুট পারমিট দিয়ে থাকে। কিন্তু ভাড়ার বিষয়টি থাকে পুরোপুরি উপেক্ষিত।

১. মালিক ও চালক সমিতির একচেটিয়া আধিপত্য: অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইজিবাইকের ভাড়া বৃদ্ধি করে স্থানীয় ‘ইজিবাইক মালিক ও চালক সমিতি’। মজার ব্যাপার হলো, আইনিভাবে এই ধরনের সমিতির ভাড়া নির্ধারণ করার কোনো এখতিয়ার নেই।

২. অনুমতির নামে ‘অদৃশ্য আপস’: মালিক সমিতিগুলো ভাড়া বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রশাসন বা সিটি কর্পোরেশনের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো লিখিত অনুমতি নেয় না। তারা মূলত স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব, পেশিশক্তি এবং অলিখিত সিন্ডিকেটের জোরে ভাড়া বাড়িয়ে দেয়। অনেক সময় প্রশাসনকে “জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি” বা “বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধির” অজুহাত দেখিয়ে ধর্মঘটের হুমকি দিয়ে একটি মৌখিক বা নীরব সম্মতি আদায় করে নেওয়া হয়।

“ভাড়া বৃদ্ধির এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ বেআইনি হলেও, স্থানীয় প্রশাসন অনেক সময় রাজনৈতিক চাপের কারণে বা জনরোষ এড়াতে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে।”

ভোগান্তির মূলে: নেপথ্যের কারণগুলো

শুধুমাত্র চালক বা মালিকদের দোষারোপ করলেই পুরো চিত্রটি পরিষ্কার হয় না। একজন বিশ্লেষক বা গবেষকের দৃষ্টিতে দেখলে এর পেছনে আরও কিছু কাঠামোগত ত্রুটি রয়েছে, যার কারণে যাত্রীরা ভোগান্তির শিকার হন:

  • অদৃশ্য চাঁদা ও লাইনম্যান প্রথা: প্রতিটি ইজিবাইক চালককে প্রতিদিন রাস্তায় বের হলেই বিভিন্ন পয়েন্টে ‘লাইনম্যান’ বা স্থানীয় প্রভাবশালীদের নির্দিষ্ট অঙ্কের চাঁদা দিতে হয়। এই চাঁদার টাকা, গ্যারেজ ভাড়া এবং ব্যাটারি চার্জের খরচ ওঠানোর চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ যাত্রীদের পকেট কেটেই মেটানো হয়।
  • বিকল্প গণপরিবহনের অভাব: শহরগুলোতে পর্যাপ্ত এবং মানসম্মত লোকাল বাস সার্ভিস বা অন্য কোনো সাশ্রয়ী গণপরিবহন নেই। এই সুযোগটিই ইজিবাইক সিন্ডিকেট কাজে লাগায়। তারা জানে, যাত্রীদের বাধ্য হয়ে এই বাহনটিতেই উঠতে হবে।
  • আইনি কাঠামোর অভাব: ইজিবাইক এখনো বাংলাদেশের পরিবহন আইনে পুরোপুরি স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত কোনো বাহন নয়। এর কোনো মিটার সিস্টেম নেই। ফলে ভাড়ার ক্ষেত্রে কোনো মানদণ্ড বা ‘স্ট্যান্ডার্ড রেট’ কাজ করে না।
  • প্রশাসনের নজরদারির শূন্যতা: মাঝেমধ্যে লোক দেখানো ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হলেও, নিয়মিত নজরদারির কোনো ব্যবস্থা নেই। যাত্রীরা অতিরিক্ত ভাড়ার শিকার হলে তাৎক্ষণিক অভিযোগ জানানোর কোনো জায়গাও পান না।

সমাধানের পথ কোথায়?

ইজিবাইক সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য অত্যন্ত জরুরি একটি মাধ্যম, কিন্তু এর ব্যবস্থাপনা চরম বিশৃঙ্খল। এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেতে হলে বিষয়টিকে শুধু চালক বনাম যাত্রীর দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে চলবে না।

সিটি কর্পোরেশন ও বিআরটিএ-কে সম্মিলিতভাবে ইজিবাইকের একটি যৌক্তিক ও নির্দিষ্ট ভাড়ার চার্ট তৈরি করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, রাস্তায় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় চলা চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। তা না হলে সমিতির এই স্বেচ্ছাচারিতা চলতেই থাকবে এবং সাধারণ মানুষের পকেট কাটার এই উৎসব কখনোই থামবে না।

Share This News