বেইজিংমুখী মোড়: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাই-প্রোফাইল চীন সফরের আদ্যোপান্ত

মালয়েশিয়ায় সংক্ষিপ্ত সফর শেষ করে তিন দিনের (২৪-২৬ জুন) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সফরে চীনে অবস্থান করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশ্বমঞ্চে এটি তার সরকারের প্রথম বড় কোনো কূটনৈতিক পদক্ষেপ। বিপুল পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, আটকে থাকা অবকাঠামো প্রকল্পে গতি আনা এবং একটি স্বাধীন “সবার আগে বাংলাদেশ” (Bangladesh First) পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবায়ন—এগুলোই এই সফরের মূল লক্ষ্য।

২০২৯ সালে স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ, তাই এই মুহূর্তে শিল্প খাতকে আধুনিকীকরণে ঢাকার জরুরি ভিত্তিতে বিদেশি মূলধন প্রয়োজন। অন্যদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন সরকার কীভাবে নয়াদিল্লির ওপর প্রথাগত নির্ভরশীলতা এবং বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক সুবিধার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে, তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছে গোটা বিশ্ব।

১. জলবায়ু নেতৃত্ব এবং সামার দাভোস

রাষ্ট্রীয় আলোচনার জন্য বেইজিং যাওয়ার আগে, প্রধানমন্ত্রীর প্রথম গন্তব্য ছিল বন্দর নগরী দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের “সামার দাভোস”।

বিশ্বের ১৭০০ জনেরও বেশি প্রতিনিধির সামনে তিনি “পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জলবায়ু নেতৃত্ব” শীর্ষক মূল বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বাংলাদেশকে কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের অসহায় শিকার হিসেবে নয়, বরং সবুজ বিনিয়োগের একটি লাভজনক ও সম্ভাবনাময় কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি ২০,০০০ কিলোমিটার নদী ও খাল খনন এবং ২৫ কোটি গাছ লাগানোর মতো মেগা পরিকল্পনার কথা জানান, যার সাথে তিনি উন্নত বিদেশি পুঁজির প্রয়োজনীয়তার সরাসরি যোগসূত্র স্থাপন করেন।

২. মেগা কূটনৈতিক প্যাকেজ

বেইজিংয়ে দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ সম্মেলনের মূল আকর্ষণ হলো ১৫ থেকে ১৭টি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত করা। পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামের ব্রিফিং এবং আমাদের কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, এসব চুক্তির উদ্দেশ্য হলো দুই দেশের সম্পর্ককে গতানুগতিক ঋণ সহায়তা থেকে বের করে গভীর অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের দিকে নিয়ে যাওয়া:

  • ১৩টি সমঝোতা স্মারক (MoUs): ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসার, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর বিষয়ক।
  • চুক্তি ও প্রটোকল: সরাসরি আর্থিক সহযোগিতা, বাণিজ্য সমতা এবং কৌশলগত যোগাযোগের কাঠামো প্রতিষ্ঠা।
  • অ্যাকশন প্ল্যান (কর্মপরিকল্পনা): চলমান কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকা মেগা অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা।

৩. বহুল আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা

ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে এটি সফরের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়। ভারতের সাথে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে দশকের পর দশক ধরে চলা স্থগিতাবস্থার পর, বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের কাছে সমন্বিত তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের প্রস্তাব নিয়ে গেছে। নদী ড্রেজিং, বাঁধ নির্মাণ এবং জলাধার তৈরির জন্য ঢাকা চীনের প্রকৌশলগত দক্ষতা ও আর্থিক সহায়তা চাইছে। এটি চূড়ান্ত হলে তা রহমান প্রশাসনের জন্য একটি বিশাল অভ্যন্তরীণ বিজয় হবে, তবে এটি নয়াদিল্লির উদ্বেগ যে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

৪. উন্নত উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণ

চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম ব্যবসায়িক অংশীদার হলেও, বাণিজ্য ঘাটতি মারাত্মকভাবে বেইজিংয়ের অনুকূলে। প্রধানমন্ত্রী সক্রিয়ভাবে এই ঘাটতি কমানোর চেষ্টা করছেন।

২৫ জুন বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (BIDA) আয়োজিত “বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম”-এ প্রধানমন্ত্রী ৪০ কোটি ডলারের স্বল্পমেয়াদি চীনা বিনিয়োগের আহ্বান জানাচ্ছেন। কৌশলগতভাবে সাধারণ অবকাঠামো (যেমন- রাস্তাঘাট বা ব্রিজ) থেকে সরে গিয়ে এখন উন্নত উৎপাদন খাতে জোর দেওয়া হচ্ছে। ঢাকা সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রিক ভেহিকেল (EV) ব্যাটারি, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং আইটি সেবার উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের জন্য সিসিইসিসি (CCECC)-এর মতো বৃহৎ চীনা শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। এর ফলে প্রযুক্তি স্থানান্তর হবে এবং তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় চীনে রপ্তানির সুযোগ বাড়বে।

৫. প্রতিরক্ষা চুক্তির অগ্রগতি

অর্থনৈতিক কূটনীতি জনসমক্ষে বেশি প্রাধান্য পেলেও, প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও এই সফরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রাপ্ত তথ্যমতে, বাংলাদেশ ২৪টি উন্নত চীনা জে-১০সিই (J-10CE) মাল্টি-রোল ফাইটার জেট কেনার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিতে চীনের শীর্ষ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের সাথে আলাদা ও রুদ্ধদ্বার আলোচনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

৬. ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি

এই সফরের সবচেয়ে আলোচিত দিকটি হলো প্রধানমন্ত্রীর গন্তব্য নির্বাচন। প্রথাগতভাবে সরকার প্রধানের প্রথম বিদেশ সফরে ভারতে যাওয়ার রেওয়াজ ভেঙে মালয়েশিয়া ও চীনে যাওয়া ঐতিহাসিক রীতির একটি স্পষ্ট পরিবর্তন।

তবে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এটিকে নয়াদিল্লির প্রতি সরাসরি বিদ্বেষ হিসেবে দেখছেন না:

  • “সবার আগে বাংলাদেশ” কৌশল: প্রশাসন একটি স্বাধীন ও বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতি তুলে ধরার চেষ্টা করছে। তারা দেশের জনগণকে বোঝাতে চায় যে বাংলাদেশ কোনো একক প্রতিবেশীর ওপর নির্ভরশীল নয়।
  • দ্বিমুখী দ্বন্দ্ব এড়ানো: সরাসরি চীনে না গিয়ে প্রথমে মালয়েশিয়া সফরের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে “ভারত বনাম চীন” বিতর্ক এড়িয়ে গেছেন।
  • অপরিহার্য ভারসাম্য: নয়াদিল্লির কূটনৈতিক মহল বোঝে যে ঢাকার বেইজিংমুখী হওয়ার পেছনে বিপুল পুঁজির প্রয়োজনীয়তা কাজ করছে। বিশ্লেষকরা একমত যে অচিরেই প্রধানমন্ত্রীর একটি আনুষ্ঠানিক ভারত সফর অবধারিত। কারণ সীমান্ত নিরাপত্তা, পানিবণ্টন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ঢাকার ভারতের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা অপরিহার্য।
Share This News