গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে যখন জনজীবন অতিষ্ঠ, তখন স্বস্তি পেতে অনেকেই নির্ভর করছেন এয়ার কন্ডিশনার (এসি) বা ফ্যানের ওপর। কিন্তু এতে একদিকে যেমন হু হু করে বাড়ছে বিদ্যুতের বিল, অন্যদিকে লোডশেডিংয়ের সময় নেমে আসছে চরম ভোগান্তি। কেমন হতো, যদি কোনো বিদ্যুৎ ছাড়াই আপনার ঘরের তাপমাত্রা বাইরের চেয়ে ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ঠান্ডা রাখা যেত? কল্পনার মতো শোনালোও বিজ্ঞানীরা এখন এমনই এক অবিশ্বাস্য প্রযুক্তি নিয়ে এসেছেন, যার নাম ‘প্যাসিভ কুলিং পেইন্ট’ (Passive Radiative Cooling Paint) বা বিশেষ আল্ট্রা-হোয়াইট রং
কী এই প্যাসিভ কুলিং পেইন্ট?
সহজ কথায়, এটি এমন এক ধরনের বিশেষ সাদা রং, যা ঘরের ছাদ বা দেওয়ালে লাগিয়ে দিলে তা সূর্যের আলোকে প্রায় পুরোপুরি ফিরিয়ে দিতে পারে। আমরা জানি, সাধারণ সাদা রং সূর্যের আলোর কিছুটা প্রতিফলিত করলেও অনেকটা তাপ শুষে নেয়। কিন্তু বিজ্ঞানীদের তৈরি এই নতুন আল্ট্রা-হোয়াইট পেইন্ট সূর্যের আলোর ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত প্রতিফলিত করতে সক্ষম। ফলে ছাদ বা দেওয়াল গরম হতে পারে না।
কীভাবে কাজ করে এই জাদুকরী প্রযুক্তি?
এই বিশেষ রংটি কাজ করে পদার্থবিজ্ঞানের একটি চমৎকার নিয়ম মেনে, যাকে বলা হয় ‘প্যাসিভ রেডিয়েন্টিভ কুলিং’ (Passive Radiative Cooling)।
- তাপ ফিরিয়ে দেওয়া: এই রঙে ব্যবহার করা হয়েছে বিশেষ রাসায়নিক উপাদান (যেমন: বেরিয়াম সালফেট বা টাইটানিয়াম ডাই অক্সাইড-এর বিশেষ ন্যানো-কণা)। এটি সূর্যের আলো পড়ার সাথে সাথে তা আয়নার মতো ফিরিয়ে দেয়।
- মহাকাশে তাপ প্রেরণ: সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, এই রং ঘরের ভেতরের জমে থাকা তাপকে ইনফ্রারেড (Infrared) তরঙ্গ হিসেবে সরাসরি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ভেদ করে মহাকাশের (Deep Space) দিকে পাঠিয়ে দেয়!
- ফলাফল: যেহেতু কোনো তাপ ঘরের ভেতরে ঢুকতে পারে না এবং ভেতরের তাপও বাইরে বেরিয়ে যায়, তাই ভরদুপুরেও ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা বাইরের চেয়ে ৭ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কম থাকে।
সাধারণ মানুষের জন্য এর গুরুত্ব কোথায়? (Why It Matters)
এই প্রযুক্তিটি শুধু বিজ্ঞানীদের গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ নয়, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এটি এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে:
- বিদ্যুৎ বিলের বিপুল সাশ্রয়: ঘর প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা থাকায় এসি বা ফ্যান ব্যবহারের প্রয়োজন অনেক কমে যাবে। গবেষকদের মতে, এটি ব্যবহার করলে বাড়ির কুলিং খরচ বা বিদ্যুৎ বিল প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব।
- লোডশেডিংয়েও স্বস্তি: যেহেতু এই রং কাজ করতে কোনো বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় না, তাই দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের সময়েও ঘর থাকবে আরামদায়ক ও শীতল।
- পরিবেশ রক্ষা ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাস: এসি চালানোর কারণে বায়ুমণ্ডলে প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাস ও কার্বন নির্গত হয়। প্যাসিভ কুলিং পেইন্ট ব্যবহারের ফলে এসির ওপর নির্ভরশীলতা কমবে, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা বা গ্লোবাল ওয়ামিং রোধে দারুণ ভূমিকা রাখবে।
- শহরাঞ্চলের ‘হিট আইল্যান্ড’ সমস্যা সমাধান: ইটের ভাটা আর কংক্রিটের শহরে গরম বেশি অনুভূত হয়। শহরের সব ভবনের ছাদে এই রং ব্যবহার করা হলে পুরো শহরের তাপমাত্রাই কয়েক ডিগ্রি কমিয়ে আনা সম্ভব।
কবে নাগাদ বাজারে আসছে এই রং?
আমেরিকার পারডিউ ইউনিভার্সিটি (Purdue University) থেকে শুরু করে বিশ্বের বড় বড় বেশ কিছু গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক পেইন্ট কোম্পানি এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর পরীক্ষামূলক ব্যবহার দারুণ সফল হয়েছে। খুব শীঘ্রই এই রং সাধারণ ক্রেতাদের জন্য বাজারের সাধারণ রঙের দামের আশেপাশেই সহজলভ্য হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
প্রযুক্তির এই অগ্রগতি প্রমাণ করে যে, প্রকৃতির সাথে লড়াই করে নয়, বরং বিজ্ঞানের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমেই আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারি। বিদ্যুৎ ছাড়াই ঘর ঠান্ডা রাখার এই ‘প্যাসিভ কুলিং পেইন্ট’ অদূর ভবিষ্যতে আমাদের আবাসন এবং নির্মাণ শিল্পে এক নতুন বিপ্লব ঘটাতে যাচ্ছে।
Source : আমেরিকার বিখ্যাত পারডু ইউনিভার্সিটি (Purdue University)।