তেল রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় মস্কোর বিলিয়ন ডলার ক্ষতি, ইউরোপীয় দেশগুলোকে সতর্ক করল ক্রেমলিন
গত দুই সপ্তাহে ইউক্রেন রাশিয়ার তেল ও গ্যাস অবকাঠামোতে এমন ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে যে, মস্কো এবার ইউরোপীয় দেশগুলোকে সরাসরি সতর্কবার্তা দিতে বাধ্য হয়েছে। রাশিয়ার বক্তব্য — ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোন তৈরিতে সহায়তা করা মানে রাশিয়ার সাথে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো।
এই সপ্তাহে ইউক্রেন ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর সাথে নতুন চুক্তি সই করার পরই এই সতর্কবার্তা এসেছে।
ইউরোপকে রাশিয়ার হুঁশিয়ারি
বুধবার রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “আমরা এই সিদ্ধান্তকে একটি ইচ্ছাকৃত পদক্ষেপ বলে মনে করি, যা পুরো ইউরোপীয় মহাদেশে সামরিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি করবে এবং এই দেশগুলোকে ধীরে ধীরে ইউক্রেনের কৌশলগত ঘাঁটিতে পরিণত করবে।”
রাশিয়া সতর্ক করেছে যে এর “অপ্রত্যাশিত পরিণতি” হতে পারে এবং বলেছে, “ইউরোপীয় নেতাদের এই পদক্ষেপ তাদের দেশগুলোকে ক্রমবর্ধমানভাবে রাশিয়ার সাথে যুদ্ধে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।”
রাশিয়া ইউক্রেনের সাথে যৌথভাবে অস্ত্র উৎপাদনে জড়িত ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর ঠিকানার একটি তালিকাও প্রকাশ করেছে।
রাশিয়ার প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এবং জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের উপ-প্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ পরে স্পষ্ট করে বলেছেন, এটি মূলত “রাশিয়ান সশস্ত্র বাহিনীর সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকা”।
ইউরোপের ড্রোন সহায়তা
মঙ্গলবার জার্মানি ইউক্রেনের দূরপাল্লার হামলা সক্ষমতায় ৩০ কোটি ইউরো (৩৫৫ মিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগ করতে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি রাশিয়ান যুদ্ধক্ষেত্রের সরবরাহ লাইনের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ৫ হাজার মধ্যম দূরত্বের আক্রমণকারী ড্রোনে আলাদাভাবে বিনিয়োগ করবে।
নরওয়েও ইউক্রেনের সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে যা যৌথভাবে ড্রোন উৎপাদনের দিকে নিয়ে যাবে এবং ইউক্রেনীয় ফ্রন্ট লাইনে ড্রোন সহায়তায় ৫৬ কোটি ইউরো (৬৬১.৫ মিলিয়ন ডলার) দান করেছে।
নেদারল্যান্ডস ড্রোন সহায়তায় ২৪৮ মিলিয়ন ইউরো (২৯৩ মিলিয়ন ডলার) ঘোষণা করেছে এবং বেলজিয়াম ৮৫ মিলিয়ন ইউরো (১০০ মিলিয়ন ডলার) প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
পুতিনের হারানো কোটি ডলার
রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ সংকট দেখা দেওয়ায় রাশিয়ার গ্যাজপ্রমসহ বিশ্বের বৃহত্তম ১০০টি তেল কোম্পানি মার্চ মাসে ২৩ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করেছে।
কিন্তু ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার তেল রপ্তানি টার্মিনাল ও অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ায় এই মুনাফার একটা বড় অংশই হাতছাড়া হয়ে গেছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, ইউক্রেন রাশিয়ার প্রতিদিন অন্তত ২০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানির সক্ষমতা ধ্বংস করে দেওয়ায় রাশিয়া তার সম্ভাব্য বিশাল মুনাফার ৪০ শতাংশ হারিয়েছে।
শুধু গত এক সপ্তাহেই ইউক্রেনের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে:
- উত্তর কাস্পিয়ান সাগরে দুটি ড্রিলিং প্ল্যাটফর্ম
- ভলগোগ্রাড ও ক্রাসনোদার অঞ্চলে দুটি তেল পাম্পিং স্টেশন
- মস্কোর উত্তর-পশ্চিমে তভের শহরে একটি তেল ডিপো
- ভলগা অঞ্চলের চেরেপোভেটস অ্যাজট অ্যামোনিয়া প্ল্যান্ট
- বাশকোরতোস্তান প্রজাতন্ত্রের স্তেরলিতামাক পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্ট
- কৃষ্ণ সাগরের তুয়াপসে তেল রপ্তানি টার্মিনাল ও শোধনাগার
“গভীর আঘাত এখন আর চাঞ্চল্যকর নয়”
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, “আজকে আমাদের গভীর হামলা আর কোনো চাঞ্চল্যকর ব্যাপার নয়।” তার এই কথায় বোঝা যায়, রাশিয়ার গভীরে আঘাত হানার ক্ষমতা এখন ইউক্রেনের কাছে কতটা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
তার প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রী সেরহি “ফ্ল্যাশ” বেসক্রেস্টনভ উল্লেখ করেছেন যে রাশিয়া তার বিশাল ভূখণ্ড রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে পারছে না। তিনি ট্রাক-মাউন্টেড R-77-1 এয়ার-টু-এয়ার মিসাইলসহ রাশিয়ান তাৎক্ষণিক বিমান প্রতিরক্ষার ছবি পোস্ট করেছেন।
ওয়াশিংটন ভিত্তিক থিংক ট্যাংক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অফ ওয়ার লিখেছে, “ইউক্রেনের বারবার ব্যাপক ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে রক্ষা পেতে রাশিয়া পুরোপুরি মোবাইল ফায়ার টিম, ড্রোন ইন্টারসেপ্টর বা অন্যান্য স্বল্প মূল্যের বিতরণযোগ্য ব্যবস্থা তৈরি বা মোতায়েন করতে পারেনি।”
অন্যদিকে, ইউক্রেন গত বছর থেকে তার দেশীয় অস্ত্র শিল্প এমনভাবে গড়ে তুলেছে যে পশ্চিমা সরবরাহ — এবং অনুমতি — ছাড়াই রাশিয়ায় আঘাত হানতে পারছে।
মঙ্গলবার জেলেনস্কি একটি ভিডিও প্রকাশ করেছেন, যা এখন ‘অস্ত্র নির্মাতা দিবস’ নামে পরিচিত, যেখানে ৩১ ধরনের ড্রোনসহ ৫৬ ধরনের ইউক্রেনীয়-নির্মিত অস্ত্র প্রদর্শন করা হয়েছে।
প্রাক্তন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রুস্তেম উমেরভ বলেছেন, “পূর্ণ মাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা ৫০ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।” তিনি ২০২৫ সালে ড্রোন উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি
মার্চের শেষ ১০ দিন এবং এপ্রিলের প্রথম ১০ দিনে ইউক্রেন রাশিয়ার তেল অবকাঠামোতে সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ক্ষতি সাধন করেছে। বিশেষ করে ২২ মার্চ থেকে বাল্টিক বন্দর প্রিমোর্স্ক ও উস্ত-লুগায় রাশিয়ার তেল টার্মিনালে কঠিন আঘাত হানা হয়েছে।
স্যাটেলাইট ফটোগ্রাফি থেকে দেখা গেছে, প্রিমোর্স্ক তার ৪০ শতাংশ স্টোরেজ সুবিধা এবং উস্ত-লুগা ৩০ শতাংশ হারিয়েছে। বাজার সূত্র জানিয়েছে, রাশিয়ান এনার্জি কোম্পানি নোভাটেক উস্ত-লুগায় গ্যাস কনডেনসেট প্রসেসিং ও রপ্তানি স্থগিত করেছে।
৩ এপ্রিল পর্যন্ত দুই বন্দর থেকে তেল চালান পরিচালনা করা যাচ্ছিল না, শিল্প সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে। ফিনিশ সামুদ্রিক কর্মকর্তারা এপ্রিলের শুরুতে সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, সাপ্তাহিক গড়ে ৪০-৫০টি জাহাজের পরিবর্তে দুই বন্দর থেকে চালান কমে গেছে “পৃথক জাহাজে”।
জেলেনস্কি হামলা জায়েজ করে বলেছেন, “শুধুমাত্র উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতিই রাশিয়াকে এই যুদ্ধ ত্যাগ করার দৃশ্যপট বিবেচনা করতে বাধ্য করে।”
সূত্র: আল জাজিরা