ইসরায়েলি হামলায় লেবাননীয় সাংবাদিক নিহত, ইরান-মার্কিন আলোচনা স্থবির

২৩ এপ্রিল, ২০২৬

দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় বুধবার কমপক্ষে পাঁচজন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে রয়েছেন লেবাননীয় সাংবাদিক আমাল খলিল। লেবাননের সরকার এই হত্যাকাণ্ডকে “জঘন্য অপরাধ” হিসেবে অভিহিত করেছে। একই সময়ে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের কারণে ইরান-মার্কিন শান্তি আলোচনা থমকে আছে বলে তেহরান জানিয়েছে।

সাংবাদিক হত্যা এবং উদ্ধার অভিযানে বাধা

আল-আখবার পত্রিকার সাংবাদিক আমাল খলিল তার সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালনকালে নিহত হন, যা লেবাননের জাতীয় সংবাদ সংস্থা (এনএনএ) নিশ্চিত করেছে। মার্চ মাস থেকে ইসরায়েল লেবাননে মোট চারজন গণমাধ্যম কর্মীকে হত্যা করেছে, আমাল খলিল তাদের মধ্যে চতুর্থ।

দুইজন সাংবাদিক দক্ষিণ লেবাননের তায়েরি শহরে একটি ভবনে আশ্রয় নিয়েছিলেন যখন ওই ভবনেই হামলা চালানো হয়। অপর সাংবাদিক জয়নব ফারাজ, যিনি একজন ফ্রিল্যান্স আলোকচিত্রী, গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন।

উদ্ধার কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) সতর্ক করে বলেছে যে উদ্ধার প্রচেষ্টায় ইসরায়েলের বাধা যুদ্ধাপরাধ হতে পারে এবং আমাল খলিল সরাসরি মৃত্যু হুমকি পেয়েছিলেন বলেও তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

সিপিজের আঞ্চলিক পরিচালক সারা কুদাহ বলেন, “একই স্থানে বারবার হামলা, যেখানে সাংবাদিকরা আশ্রয় নিয়েছিলেন সেখানে আক্রমণ, এবং চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা দেওয়া – এগুলো আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন”।

লেবাননের প্রতিক্রিয়া

লেবাননের প্রধানমন্ত্রী এই হামলার পর ইসরায়েলকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন। এই হামলা ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে গত শুক্রবার থেকে কার্যকর হওয়া একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির সময়েই সংঘটিত হয়েছে, যার উদ্দেশ্য ছিল ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর সঙ্গে লড়াই স্থগিত রাখা।

কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সব সাংবাদিক ও গণমাধ্যম কর্মীদের হত্যার দুই-তৃতীয়াংশের জন্য ইসরায়েল দায়ী ছিল।

ইরান-মার্কিন আলোচনা স্থবির

উচ্চপদস্থ ইরানি কর্মকর্তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেশটির বন্দরের নৌ-অবরোধের কারণে শান্তি আলোচনা স্থগিত থাকার জন্য ওয়াশিংটনকে দায়ী করেছেন। একই সময়ে, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড জানিয়েছে যে তারা হরমুজ প্রণালীতে সামুদ্রিক নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে দুটি বিদেশি জাহাজ আটক করেছে এবং তৃতীয় একটি জাহাজে গুলি চালিয়েছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বুধবার এক অনলাইন বিবৃতিতে বলেন, ইরান সংলাপে আগ্রহী কিন্তু “প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, অবরোধ এবং হুমকি প্রকৃত আলোচনার প্রধান বাধা”।

ইরানের প্রধান আলোচক এবং পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন যে সামুদ্রিক অবরোধ দ্বারা লঙ্ঘন না করা হলেই কেবল যুদ্ধবিরতি অর্থবহ হয়।

মার্কিন অবস্থান ও যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণ

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে এক পোস্টে লিখেছেন যে আলোচনা ভালোভাবে হয়েছিল, বেশিরভাগ বিষয়ে সম্মতি হয়েছে, কিন্তু একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় – পারমাণবিক – তাতে সম্মতি হয়নি।

তিনি ঘোষণা করেন: “অবিলম্বে কার্যকরভাবে, মার্কিন নৌবাহিনী, যা বিশ্বের সেরা, হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রবেশ বা প্রস্থানের চেষ্টা করা যেকোনো জাহাজকে অবরোধ করার প্রক্রিয়া শুরু করবে”।

যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণ ঘোষণা করা হলেও, ট্রাম্প জানিয়েছেন যে ইরানি বন্দরের অবরোধ অব্যাহত থাকবে।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স ওয়াশিংটনের প্রধান আলোচক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রথম দফার আলোচনা ভেঙে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন ইরান পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়নি।

পাকিস্তানে দ্বিতীয় দফার আলোচনার জন্য ভান্সের প্রত্যাশিত সফর বাতিল করা হয়েছে, কারণ ইরান জানিয়েছে যে তারা এতে অংশ নেবে না।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্কতার সঙ্গে ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণের ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি তার মুখপাত্রের মাধ্যমে এক বিবৃতিতে বলেন, “এটি পরিস্থিতি শিথিলকরণ এবং ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনীতি ও আস্থা তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান সৃষ্টির দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ”।

পরিস্থিতির জটিলতা

হরমুজ প্রণালী একটি কৌশলগত জলপথ, যেখান দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস স্বাভাবিকভাবে পরিবহন হয়। ফেব্রুয়ারি ২৮ তারিখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আক্রমণের পর থেকে ইরান হরমুজ প্রণালীর উপর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ শুরু করেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট চলমান রয়েছে এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ এখনও অনিশ্চিত।


সূত্র: আল জাজিরা, সিএনএন, এনপিআর, কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস

Share This News