লবণাক্ত পানি, তাপপ্রবাহ, ডেঙ্গু ও দুর্যোগের পরের সংকটে বিপর্যস্ত উপকূলবাসীর জীবন
– কাজী মোহাম্মদ হাসিবুল হক
বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে বাংলাদেশের উপকূলীয় জনপদগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর শুধু নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় কিংবা ফসলের ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কয়েক বছর আগেও যেসব সমস্যা মৌসুমি দুর্যোগ হিসেবে দেখা হতো, সেগুলোর অনেকটাই এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। নিরাপদ পানির সংকট, পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা বৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, জলাবদ্ধতা, ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ এবং বন্যা বা জলোচ্ছ্বাসের পর পানিবাহিত রোগের বিস্তার উপকূলীয় মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রায় নতুন চাপ তৈরি করছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল ১৯টি জেলা ও ১৪৮টি উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত। এই বিশাল এলাকায় বসবাসকারী মানুষের বড় একটি অংশ কৃষি, মৎস্য, চিংড়ি চাষ, দিনমজুরি, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদনির্ভর পেশার ওপর নির্ভরশীল। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিবেশের কোনো একটি উপাদানে পরিবর্তন এলেই তার প্রভাব সরাসরি মানুষের আয়, খাদ্য ও স্বাস্থ্যের ওপর পড়ে।
উপকূলের একজন কৃষক যেমন জমিতে লবণাক্ততার কারণে আগের মতো ফসল ফলাতে পারেন না, তেমনি একজন জেলে ঘূর্ণিঝড় বা বৈরী আবহাওয়ার কারণে নিয়মিত নদী বা সাগরে যেতে পারেন না। আবার কোনো পরিবারকে পানীয় জলের জন্য দূরের উৎসে যেতে হলে তাদের সময় ও শ্রমের একটি বড় অংশ শুধু পানি সংগ্রহেই ব্যয় হয়।
লবণাক্ত পানি এখন জনস্বাস্থ্যেরও উদ্বেগ
উপকূলীয় জীবনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি দেখা যাচ্ছে পানির ক্ষেত্রে। নদী, খাল, পুকুর ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল অনেক এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে মিঠা পানির সংকট তীব্র হয়। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় লবণাক্ত পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়লে পুকুর ও অন্যান্য স্থানীয় পানির উৎসও দূষিত হয়ে যায়।
দুর্যোগ চলে যাওয়ার পরও অনেক এলাকায় সেই পানির প্রভাব দীর্ঘদিন থেকে যায়। ফলে নিরাপদ পানি সংগ্রহের জন্য মানুষকে কখনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, কখনো বিকল্প উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়।
এই পানির সংকটের সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকিও সরাসরি যুক্ত। উপকূলীয় এলাকায় পরিচালিত গবেষণায় পানীয় জলে বেশি সোডিয়ামের উপস্থিতির সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে যখন পানির লবণাক্ততা বাড়ে, তখন বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি উদ্বেগের। উপকূলীয় বাংলাদেশে পরিচালিত গবেষণায় পানীয় জলের সোডিয়ামের মাত্রা এবং গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ ও প্রি-একলাম্পসিয়ার মধ্যে সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা এখন শুধু পানি সরবরাহের বিষয় নয়; এটি উপকূলীয় জনস্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাপপ্রবাহে কমছে কর্মক্ষমতা
জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি বড় প্রভাব হচ্ছে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও ঘন ঘন তাপপ্রবাহ। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলেও এর প্রভাব পড়ছে।কৃষক, দিনমজুর, নির্মাণশ্রমিক, রিকশা-ভ্যানচালক, জেলে কিংবা বাইরে কাজ করা অন্য শ্রমজীবী মানুষের জন্য অতিরিক্ত গরম একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রচণ্ড তাপের মধ্যে দীর্ঘ সময় কাজ করলে শরীরে পানিশূন্যতা ও তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে কর্মঘণ্টা কমে যাওয়ায় আয়েও প্রভাব পড়ে।
ল্যানসেট কাউন্টডাউন ২০২৫-এর বাংলাদেশ ডেটাশিট অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশের মানুষ গড়ে ২৮ দশমিক ৮ দিন তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৩ দশমিক ২ দিন এমন তাপপ্রবাহ ছিল, যা মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন না থাকলে ঘটার সম্ভাবনা ছিল না। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে অতিরিক্ত তাপের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ২৯ বিলিয়ন সম্ভাব্য শ্রমঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। ১৯৯০–১৯৯৯ সময়ের গড়ের তুলনায় এই ক্ষতি ৯২ শতাংশ বেশি। কৃষি খাতেই হারানো শ্রমঘণ্টার বড় অংশের প্রভাব পড়েছে। তাপপ্রবাহ তাই শুধু আবহাওয়ার বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, শ্রমবাজার ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও যুক্ত।
উপকূলেও বাড়ছে ডেঙ্গুর চাপ
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মশাবাহিত রোগের বিস্তারের সম্পর্ক নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। একসময় ডেঙ্গুকে মূলত শহরকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে দেখা হলেও বর্তমানে দেশের বিভিন্ন গ্রামীণ ও উপকূলীয় এলাকায়ও রোগটির বিস্তার দেখা যাচ্ছে।২০২৫ সালে বরগুনায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছিল। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ওই বছরের জুনের মাঝামাঝি সময়ে জেলায় ২ হাজারের বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছিল এবং কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছিল।
আইইডিসিআরের মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে বরগুনা পৌর এলাকার কিছু অংশকে ডেঙ্গুর জন্য উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সেখানে পানি সংকটের কারণে অনেক পরিবার বৃষ্টির পানি বিভিন্ন পাত্রে সংরক্ষণ করছিল। যথাযথভাবে ঢেকে না রাখা এসব পাত্র এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন এডিস মশার বিস্তার ও বেঁচে থাকার পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে। ল্যানসেট কাউন্টডাউন ২০২৫-এর বাংলাদেশ ডেটাশিটেও দেশে ডেঙ্গু সংক্রমণের উপযোগী পরিবেশ বৃদ্ধির প্রবণতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করলে সমস্যার পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পানি জমে থাকা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং মানুষের আচরণও এর বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উপকূলীয় এলাকায় পানি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা ও মশা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা তাই একই সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।
বন্যা-জলোচ্ছ্বাসের পর রোগের ঝুঁকি
ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের সময় সরাসরি প্রাণহানির পাশাপাশি দুর্যোগ-পরবর্তী স্বাস্থ্যঝুঁকিও বড় হয়ে ওঠে। জলোচ্ছ্বাসের লবণাক্ত পানি পুকুর ও অন্যান্য স্থানীয় পানির উৎসে ঢুকে পড়তে পারে। আবার বন্যার পানিতে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে পানীয় জলের উৎস দূষিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এ সময় ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোও অনেক সময় রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খায়। রাস্তা বা যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে দূরের হাসপাতাল বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগী নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। দুর্যোগ শেষ হওয়ার পরও স্বাস্থ্যঝুঁকি দ্রুত শেষ হয় না। অনেক পরিবারকে দীর্ঘ সময় অস্থায়ী আশ্রয়ে থাকতে হয়। সেখানে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, খাবার ও প্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যবস্থা পর্যাপ্ত না হলে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।নারী ও শিশুর ঝুঁকি বেশিজলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না। উপকূলীয় নারী ও শিশুরা অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি ঝুঁকিতে থাকে। অনেক পরিবারে পানি সংগ্রহের প্রধান দায়িত্ব নারীদের ওপর থাকে। ফলে নিরাপদ পানির উৎস দূরে সরে গেলে তাদের বাড়তি সময় ও শ্রম ব্যয় করতে হয়। পানি ও স্যানিটেশনের সংকট কিশোরীদের মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাকেও কঠিন করে তুলতে পারে।
সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর নারীদের নিয়ে ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তন, পানি সংকট ও স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি উঠে এসেছে। গবেষণায় স্বাস্থ্যসেবা, পানি, স্যানিটেশন ও নারীদের দৈনন্দিন জীবনের ওপর জলবায়ুজনিত চাপের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। শিশুরাও একইভাবে ঝুঁকিতে। দূষিত পানি, খাদ্যের অনিশ্চয়তা ও অপুষ্টির কারণে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। কোনো দুর্যোগে পরিবারের আয় কমে গেলে শিশুর খাবার ও চিকিৎসার ব্যয় মেটানোও কঠিন হয়ে পড়ে।
বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে বাড়ছে নতুন সমস্যা
উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি বড় প্রভাব হলো মানুষের স্থানান্তর। নদীভাঙন, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড় ও জীবিকার সংকটের কারণে অনেক পরিবারকে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যেতে হয়। বাসস্থান পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের সুযোগও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। নতুন জায়গায় গিয়ে অনেক পরিবারকে নতুন করে কাজ ও বসবাসের ব্যবস্থা করতে হয়।
বাস্তুচ্যুত মানুষের ক্ষেত্রে মানসিক চাপও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঘরবাড়ি হারানো, আয় কমে যাওয়া, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বারবার স্থান পরিবর্তনের কারণে উদ্বেগ ও মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে।
ঘূর্ণিঝড়ে সাফল্য, কিন্তু নতুন চ্যালেঞ্জ সামনে
ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় বাংলাদেশের অর্জন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের পর বাংলাদেশ ধীরে ধীরে আগাম সতর্কতা, আশ্রয়কেন্দ্র, উপকূলীয় বাঁধ এবং স্বেচ্ছাসেবকভিত্তিক দুর্যোগ প্রস্তুতির একটি শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এর ফলে ঘূর্ণিঝড়ের সময় প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২২ সালের ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের সময়ও আগাম সতর্কতা ও মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
তবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সাফল্যকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে হবে। শুধু ঝড়ের সময় মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া নয়, ঝড়ের পর নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, ওষুধ, খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এখন শুধু আকস্মিক দুর্যোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা লবণাক্ততা, তাপপ্রবাহ ও রোগের বিস্তারও একইভাবে মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করছে।স্বাস্থ্যকে রাখতে হবে অভিযোজন পরিকল্পনার কেন্দ্রেজলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের বিভিন্ন পরিকল্পনা থাকলেও স্বাস্থ্যঝুঁকিকে আরও গুরুত্ব দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে।
প্রথমত, উপকূলীয় এলাকায় নিরাপদ ও কম লবণাক্ত পানির ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পানি পরিশোধন এবং স্থানীয়ভাবে উপযোগী নিরাপদ পানি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে জলবায়ু-সংবেদনশীল রোগ মোকাবিলায় আরও সক্ষম করতে হবে। ডেঙ্গু, ডায়রিয়া, তাপজনিত অসুস্থতা, চর্মরোগ এবং গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত ও চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, তাপপ্রবাহের সময় শ্রমজীবী মানুষের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পর্যাপ্ত পানি, বিশ্রামের সুযোগ এবং প্রয়োজনে কর্মঘণ্টা পুনর্বিন্যাসের মতো পদক্ষেপ নিতে হবে।
চতুর্থত, ঘূর্ণিঝড়ের আগাম সতর্কতার পাশাপাশি দুর্যোগ-পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
পঞ্চমত, উপকূলীয় প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা হিসেবে ম্যানগ্রোভ বন ও অন্যান্য উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ করতে হবে। এসব প্রাকৃতিক ব্যবস্থা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষতি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে এবং উপকূলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ।
সামনে যে বাস্তবতা
উপকূলের মানুষের কাছে জলবায়ু পরিবর্তন কোনো দূর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়। তারা এর প্রভাব এখনই অনুভব করছেন—কখনো লবণাক্ত পানিতে, কখনো তীব্র গরমে, কখনো ডেঙ্গু বা পানিবাহিত রোগে, আবার কখনো ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে হারিয়ে যাওয়া ঘরবাড়ি ও জীবিকার মাধ্যমে।
বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড়ের প্রাণহানি কমাতে যে সক্ষমতা দেখিয়েছে, সেই অভিজ্ঞতা এখন জলবায়ু পরিবর্তনের ধীরগতির স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় কাজে লাগানোর সময় এসেছে। উপকূলের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু বাঁধ, সড়ক বা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ যথেষ্ট নয়। নিরাপদ পানি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, রোগ প্রতিরোধ, পুষ্টি, নারী ও শিশু সুরক্ষা এবং বিকল্প জীবিকার বিষয়গুলোও পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে হবে।
এমনকারণ উপকূলীয় বাংলাদেশের জলবায়ু সংকট শেষ পর্যন্ত শুধু পরিবেশের সংকট নয়। এটি মানুষের স্বাস্থ্য, জীবিকা ও ভবিষ্যতের সংকট। আর এই সংকট যত দ্রুত স্বীকার করে পরিকল্পিতভাবে মোকাবিলা করা যাবে, ক্ষতির মাত্রাও তত বেশি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
লেখক: কাজী মোহাম্মদ হাসিবুল হক, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ কর্মী।
তথ্যসূত্র: ল্যানসেট কাউন্টডাউন ২০২৫—বাংলাদেশ ডেটাশিট; বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ উপকূলীয় অঞ্চল ও জলবায়ু ঝুঁকি বিষয়ক গবেষণা; Frontiers in Public Health-এ প্রকাশিত সাতক্ষীরা বিষয়ক গবেষণা; উপকূলীয় পানির লবণাক্ততা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে পিয়ার-রিভিউড গবেষণা; আইইডিসিআর ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত তথ্য।