আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি, পরে আসামি পুনরুদ্ধার
খুলনার দাকোপ উপজেলায় শনিবার (২৩ মে) দুপুরে এক অভূতপূর্ব ঘটনায় বিক্ষুব্ধ জনতা র্যাব-৬-এর গাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়ে দুই গ্রেপ্তারকৃত আসামিকে জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয়। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই নাজুক চিত্র দেখিয়ে দেয় যে রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিরুদ্ধে সরাসরি সংঘাতের সাহস কতটা বেড়েছে। তবে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পরে স্থানীয়দের সহায়তায় র্যাব ও পুলিশের যৌথ অভিযানে সন্ধ্যায় আসামিদের পুনরায় আটক করা হয়।
ঘটনার পটভূমি: মাছের ঘের নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দাকোপ উপজেলার পানখালী ইউনিয়নের খোনা এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধের বাইরে প্রায় ৪০ বিঘা জমিতে আবদুল্লাহ ফকির, বাবলু সানা ও সাজ্জাদ হোসেন সরদার কয়েক বছর ধরে মাছ চাষ করে আসছেন। সম্প্রতি এই ঘের নিয়ে মুকুন্দ মণ্ডল, বাচ্চু ফকির ও রসুল গাজীর সঙ্গে তাদের বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করে।
গত ১৬ মে সন্ধ্যায় একদল ব্যক্তি ঘেরটি জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা করে। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয় গত ২০ মে রাতে, যখন অভিযোগ ওঠে আসামিরা ঘের থেকে প্রায় ২০ হাজার টাকার মাছ লুট করে নিয়ে যায়। বাবলু সানা সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করেন, আসামি রসুল গাজী তাকে ও তার ছেলেকে হয় ঘেরের দখল ছেড়ে দিতে, নয়তো ১০ লাখ টাকা চাঁদা দিতে বলে হুমকি দেন।
মামলা ও পাল্টা হামলা
এ ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার আকরাম আলী ফকির বাদী হয়ে মুকুন্দ মণ্ডল ও রসুল গাজীসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে দাকোপ থানায় মামলা করেন। মামলার পর পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়। শুক্রবার রাতে ঘের এলাকায় হামলায় পানখালী গ্রামের জসিম মোল্লা, হাফিজুর মোল্লা, আবু মুসা শেখ, জাফর সরদার ও সাজ্জাদ হোসেন সরদার গুরুতর আহত হন। আহতদের স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
র্যাবর উপর হামলা: আইনশৃঙ্খলার ভয়াবহ অবনতি
শনিবার বেলা ১১টার দিকে স্থানীয়রা উপজেলা সদরে বিক্ষোভ মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এই সময় র্যাব-৬-এর সদস্যরা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মুকুন্দ মণ্ডল ও রসুল গাজীকে আটক করেন। আসামিদের নিয়ে যাওয়ার পথে চালনার আচাঁভুয়া বাজার এলাকায় একদল লোক র্যাবের গাড়ি অবরুদ্ধ করে বিক্ষোভ শুরু করে। এরপর তারা র্যাবের গাড়িতে সরাসরি হামলা ও ভাঙচুর চালিয়ে আসামিদের ছিনিয়ে নেয়।
র্যাবের গাড়িতে হামলা ও সরকারি বাহিনীর হাত থেকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়া শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় — এটি আইনের শাসনের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ। দেশের যেকোনো নাগরিকের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বৈধ কার্যক্রমে বাধা দেওয়া ফৌজদারি অপরাধ। এই ঘটনা স্থানীয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ কতটা দুর্বল হয়ে পড়েছে, সে প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক
ঘটনার পরপরই উপজেলা বিএনপি কার্যালয়ে তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলন করেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব আব্দুল মান্নান খান, চালনা পৌর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক শেখ মোজাফফার হোসেন ও সদস্য সচিব আলামিন সানা। তারা দাবি করেন, জমির ন্যায্য দাবিদারদের মিছিল থেকে র্যাব লোক তুলে নিচ্ছিল এবং পরিস্থিতি শান্ত করতে তারা ঘটনাস্থলে যান। তবে উল্লেখযোগ্যভাবে তারা র্যাবের গাড়ি ভাঙচুর এবং আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন।
কিন্তু দাকোপ থানার ওসি শেখ খায়রুল বাসার এবং র্যাবের -৬ কমান্ডার লে. কর্নেল নিস্তার আহমেদ উভয়ই স্বতন্ত্রভাবে নিশ্চিত করেছেন যে জনতা র্যাবের কাছ থেকে আসামি ছিনিয়ে নিয়েছে। এই দুই বক্তব্যের পরিষ্কার বৈপরীত্য তদন্তের দাবি রাখে।
র্যাবের কঠোর অবস্থান ও আসামি পুনরুদ্ধার
আসামি ছিনতাইয়ের পর র্যাব কমান্ডার স্পষ্ট জানিয়ে দেন — আসামি ছাড়া তারা ঘটনাস্থল ছাড়বেন না। অতিরিক্ত পুলিশ ও র্যাব মোতায়েন করা হয়, এমনকি সেনাবাহিনীও ঘটনাস্থলে আসে। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর সন্ধ্যা ৬টার দিকে স্থানীয় নেতাকর্মীরা আসামিদের র্যাবের কাছে হস্তান্তর করেন। র্যাবে পরে নিয়ম অনুযায়ী তাদের থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করে।