বিশেষ প্রতিবেদন
বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে (BMA) নতুন প্রতিষ্ঠিত ‘২য় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন’-এর অধীনস্থ চারটি কোম্পানির নাম ইসলামের চার খলিফার নামে— ‘উমর’, ‘আবু বকর’, ‘আলী’ এবং ‘উসমান’ রাখার পর থেকে ভারতের কিছু নির্দিষ্ট সংবাদমাধ্যমে শুরু হয়েছে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা। এই স্বাভাবিক এবং সাংস্কৃতিক নামকরণের ঘটনাকে পুঁজি করে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি নষ্ট করা এবং এটিকে “মৌলবাদ” বা “ইসলামিকরণের” সাথে মেলানোর এক অপচেষ্টায় মেতেছে। অথচ সামরিক বাহিনীতে ঐতিহাসিক বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের নামে ইউনিট বা কোম্পানির নামকরণ সারা বিশ্বেই একটি স্বীকৃত ও সাধারণ সামরিক ঐতিহ্য।
নিজস্ব সংস্কৃতি ও ইতিহাস থেকে নামকরণের অধিকার

যেকোনো দেশের সামরিক বাহিনীর ইউনিট, রেজিমেন্ট বা কোম্পানির নাম সেই দেশের নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে রাখা হয়। বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। ইসলামের চার খলিফা— হজরত আবু বকর (রা.), হজরত উমর (রা.), হজরত উসমান (রা.) এবং হজরত আলী (রা.) শুধুমাত্র ধর্মীয় ব্যক্তিত্বই নন, তারা বিশ্ব ইতিহাসে বীরত্ব, ন্যায়বিচার, শৃঙ্খলা এবং সফল নেতৃত্বের অন্যতম সেরা উদাহরণ। ক্যাডেটদের মনে সামরিক শৃঙ্খলা, বীরত্ব এবং নৈতিকতার আদর্শ গেঁথে দেওয়ার জন্যই এই নামকরণ করা হয়েছে। এটি একান্তই বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত এবং সংস্কৃতির চর্চা, এতে অন্য কোনো দেশের নাক গলানোর বা আতঙ্কিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ধর্মীয় নামকরণের ছড়াছড়ি
যে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো আজ বাংলাদেশের নামকরণে “মৌলবাদ” খুঁজছে, তাদের নিজেদের সেনাবাহিনীর কাঠামোর দিকে তাকালেই তাদের দ্বিমুখী আচরণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভারতীয় সেনাবাহিনী আগাগোড়া ধর্মীয়, পৌরাণিক এবং জাতিগত নামকরণে ভরপুর।
- রেজিমেন্টের নাম: ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ‘রাজপুত রেজিমেন্ট’, ‘মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রি’, ‘শিখ রেজিমেন্ট’, ‘ডোগরা রেজিমেন্ট’ এর মতো জাতিগত ও ধর্মভিত্তিক ইউনিট রয়েছে।
- ধর্মীয় রণধ্বনি (War Cry): রাজপুত রেজিমেন্টের রণধ্বনি হলো “বজরং বালী কি জয়” (হনুমানের জয়)। ডোগরা রেজিমেন্টের রণধ্বনি “জ্বালা মাতা কি জয়”। গাড়োয়াল রাইফেলসের রণধ্বনি “বদ্রী বিশাল লাল কি জয়” (বদ্রিনাথের জয়)। এমনকি তাদের রেজিমেন্টগুলোতে নির্দিষ্ট হিন্দু দেব-দেবীর মূর্তিও প্রতিষ্ঠিত থাকে।
- ফরমেশনের নাম: ভারতীয় সেনাবাহিনীর অনেক কোর (Corps) ও ফরমেশনের নাম হিন্দু পৌরাণিক অস্ত্রের নামে রাখা, যেমন— ‘ব্রহ্মাস্ত্র কোর’, ‘সুদর্শন চক্র কোর’ বা ‘ত্রিশক্তি কোর’।
নিজেদের সামরিক বাহিনীতে প্রকাশ্যভাবে সনাতন ধর্ম এবং পৌরাণিক ঐতিহ্য ব্যবহার করার অধিকার যদি ভারতের থাকে, তবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাদের সংস্কৃতির অংশ হিসেবে খলিফাদের নাম ব্যবহার করলে সেটি কেন “মৌলবাদ” হবে?
বিশ্বজুড়ে সামরিক ঐতিহ্যে ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক নাম
শুধুমাত্র বাংলাদেশ বা ভারত নয়, সারা বিশ্বের সামরিক ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে ঐতিহাসিক বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের নামে ইউনিটের নাম রাখা একটি সাধারণ বিষয়। যেমন, ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীতে (IDF) ‘ম্যাকাবি’ (হাশমোনিয় বীরদের নামে) বা ‘গোলানি’ ব্রিগেডের মতো ঐতিহাসিক নাম রয়েছে। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ‘কুইন্স রয়্যাল ক্রুসেডার্স’ বা বিভিন্ন সেইন্ট (যেমন: সেইন্ট জর্জ, সেইন্ট অ্যান্ড্রু)-এর নামে পদাতিক বাহিনীর নামকরণ করা হয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক ইতিহাসেও বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও ক্রুসেডীয় ধর্মীয় যোদ্ধাদের নামে সামরিক ফরমেশনের নাম রাখার ভূরি ভূরি প্রমাণ রয়েছে।
ফেক নিউজ ও অপতথ্যে বিশ্বে ১ নম্বরে ভারত: WEF রিপোর্ট
যে দেশ অন্য দেশের সামরিক বাহিনীর স্বাভাবিক নামকরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, তাদের নিজেদের গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা আজ বিশ্বজুড়ে তলানিতে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (WEF) গ্লোবাল রিস্ক রিপোর্ট ২০২৪-এর তথ্যানুযায়ী, অপতথ্য ও ভুল তথ্য (Misinformation and Disinformation) ছড়ানোর ঝুঁকির দিক থেকে ভারত সত্যিই বিশ্বের শীর্ষে (১ নম্বর) অবস্থান করছে। অর্থাৎ, বিশ্বে ফেক নিউজের সবচেয়ে বড় কারখানা এবং অপতথ্য ছড়ানোর সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক ঝুঁকি এখন ভারত নিজেই।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও রয়টার্স ইনস্টিটিউটের বৈশ্বিক ডিজিটাল নিউজ রিপোর্টের বিভিন্ন সমীক্ষাতেও দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভুয়া খবর ছড়ানোর ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান বিশ্বে ওপরের সারিতে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত মূলত দক্ষিণ এশিয়ায় ইসরায়েলের মতো একটি “ভিকটিম কার্ড” খেলতে চাইছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তারা এমন একটি বয়ান (Narrative) দাঁড় করাতে চায় যে, বাংলাদেশে হিন্দুরা বিপদে আছে এবং বাংলাদেশ ক্রমশ মৌলবাদের দিকে ঝুঁকছে। নিজেদের এই ভূ-রাজনৈতিক ফায়দা লুটতেই শীর্ষ ফেক নিউজ ছড়ানো দেশটি নিয়মিত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভুয়া খবরের আশ্রয় নিচ্ছে।

শেষ কথা
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি সুশৃঙ্খল, আধুনিক এবং পেশাদার বাহিনী। বিএমএ-তে নতুন ব্যাটালিয়নের নামকরণ করা হয়েছে ক্যাডেটদের নৈতিক ও মানসিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য। এটি কোনো রাজনৈতিক বা মৌলবাদী পদক্ষেপ নয়। বাংলাদেশের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে ভারতের এই অহেতুক মাতামাতি এবং মিথ্যা খবর ছড়ানোর অপচেষ্টা মূলত দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের খবরদারি করার মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ। ফেক নিউজের শীর্ষে (১ নম্বর) থাকা একটি দেশের মিডিয়ার ছড়ানো এই ভিত্তিহীন প্রোপাগান্ডাকে শক্তভাবে প্রত্যাখ্যান করা এবং নিজেদের স্বাধীন সিদ্ধান্তকে সমুন্নত রাখা এখন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি।