ভাষার রাজনীতি ও রাজনীতির ভাষা: আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি?

বাংলাদেশ, এই পৃথিবীর একমাত্র জাতি যারা ভাষার অধিকারের জন্য জীবন দিয়েছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন শুধু একটি দাবির আন্দোলন ছিল না, ছিল জাতিগত আত্মপরিচয় রক্ষার এক মহান সংগ্রাম। সেই সংগ্রামের মূলে ছিল বাংলা ভাষা, একটি জাতির হৃদয়স্পর্শী অস্তিত্বের নাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার এত বছর পর, আমরা নিজেরাই নিজেদের ভাষাকে ধীরে ধীরে দূরে ঠেলে দিচ্ছি। বিশেষ করে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন বাংলার জায়গায় জায়গা করে নিচ্ছে বিদেশি শব্দ ও ঔপনিবেশিক ছায়া। রাজপথে, রাজনৈতিক ব্যানারে, টকশো বা সেমিনারে যখন উচ্চারিত হয়, Blockade, Long March, Mass Uprising, One Point Demand, তখন প্রশ্ন জাগে, এই কি সেই বাংলাদেশ, যাঁর সন্তানরা বলেছিল “আমরা বাংলায় কথা বলি, বাংলায় লিখি, বাংলাতেই বাঁচি”?

ভাষা নিছক একটি যোগাযোগের মাধ্যম নয়। এটি একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি, মনন ও আত্মপরিচয়ের মৌল ভিত্তি। বহু দার্শনিক, ভাষাবিদ ও মনোবিশ্লেষক ভাষার গুরুত্ব নিয়ে গভীর মন্তব্য রেখেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, “যদি কোনো জাতিকে ধ্বংস করতে চাও, তবে তার ভাষাকে ধ্বংস করো।” এ কথা নিছক শ্লোগান নয়, এটি একটি গভীর রাজনৈতিক বাস্তবতা। ইতালীয় দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামসি তাঁর ‘Cultural Hegemony’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন, একটি জাতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে প্রথমে তার ভাষা ও সংস্কৃতির উপর দখল কায়েম করতে হয়। অস্ত্র ছাড়াও একটি জাতিকে দুর্বল করার এই ছিল ইতিহাসে বহুবার ব্যবহৃত একটি নীরব কৌশল।

আমরা আজ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে রাজনৈতিকভাবে আমরা স্বাধীন, কিন্তু মনস্তাত্ত্বিকভাবে এক ধরনের ভাষাগত পরাধীনতায় ভুগছি। বাংলার জায়গায় ইংরেজি ব্যবহারকে আমরা আধুনিকতার প্রতীক ভেবে নিচ্ছি। “অবরোধ” বা “দীর্ঘ পদযাত্রা” বলার পরিবর্তে যখন “Blockade” বা “Long March” বলি, তখন হয়তো কথার ঝলক বাড়ে, কিন্তু কমে যায় মাটির গন্ধ। কমে যায় সেই চেতনার শক্তি, যা একসময় রক্ত দিয়ে অর্জন করা হয়েছিল। তরুণ প্রজন্ম ধীরে ধীরে শিখছে, বাংলা দুর্বল, ইংরেজি মানেই স্মার্টনেস। এখান থেকেই জন্ম নেয় ভাষাগত হীনম্মন্যতা, আর এখান থেকেই শুরু হয় সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের ক্ষয়।

ভাষা হারানো মানে শুধু শব্দ হারানো নয়, এটা শিকড় হারানো। যে জাতি নিজের ভাষাকে তুচ্ছ করে, সে জাতি ধীরে ধীরে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মগৌরব হারিয়ে ফেলে। তখন তারা নিজেদের মতো দেখতে হলেও চিন্তা করে অন্যের মতো, কথা বলে অন্যের ভাষায়, আর ধীরে ধীরে তাদের জাতিগত বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে যায় বৃহৎ সংস্কৃতির ভেতর। এটি আজকের বিশ্বে অনেক ছোট জাতির ক্ষেত্রেই ঘটেছে, যেমন আদিবাসীদের ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের সংস্কৃতিও হারিয়ে গেছে, ইতিহাস হয়েছে নীরব।

এই অবস্থায় আমাদের করণীয় একটাই, ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা ও দায়বদ্ধতা ফিরিয়ে আনা। আমাদের রাজনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক চর্চায় বাংলা ভাষাকে প্রধান ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে আনতে হবে। স্লোগান, বক্তৃতা, দাবিপত্র, প্রচারপত্র, সব জায়গায় বাংলাই হোক মুখ্য ভাষা। তরুণদের শেখাতে হবে, আমাদের ভাষা দুর্বল নয়, বরং এই ভাষা বাঁচিয়ে রাখতেই আমরা জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছি। যদি ভাষা শহীদদের রক্তকে সম্মান জানাতে চাই, তাহলে শুধু ২১ ফেব্রুয়ারিতে ফুল দিলেই চলবে না, চলতে হবে বাংলার মর্যাদা রক্ষায় প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে।

বাংলার রাজনীতিতে বাংলার ভাষা ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি। ভাষা হারালে আমরা শুধু শব্দ হারাব না, হারাব আমাদের নিজস্বতা, হারাব আমাদের ভবিষ্যৎ। তাই, ভাষার আত্মরক্ষা মানে জাতির আত্মরক্ষা। আসুন, আমরা ভাষার প্রতি আমাদের দায়িত্ব পালন করি, কথায়, কাজে, চর্চায়, চেতনায়।

লেখক: কাজী মোহাম্মদ হাসিবুল হক

Share This News