মূল্যস্ফীতির চাপে দিশেহারা সাধারণ মানুষ: সরকারি বেতন বৃদ্ধির আভাসে বৈষম্য ও হতাশার ছায়া

এক নজরে সংবাদের মূল অংশ:

  • মূল্যস্ফীতির চরম চাপ: টানা তিন মাস ধরে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে; জুনে কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৯.১৬ শতাংশে, তবুও বাজারে স্বস্তি নেই।
  • বেতন বৃদ্ধির আভাস ও হতাশা: সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির আভাসে বেসরকারি ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে বাড়ছে বৈষম্য ও হতাশার অনুভূতি।
  • নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি: ঈদের পর চাল, ডাল, তেল, মুরগি, ডিম থেকে শুরু করে সবজি ও মাছের দামে নেই কোনো সুখবর; গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৮৫০ টাকায়।
  • বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা: শুধু ১৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর সুবিধা না বাড়িয়ে সমগ্র দেশের ১৮ কোটি মানুষের জন্য বাজার নিয়ন্ত্রণ ও মূল্যস্ফীতি কমানোর তাগিদ।

অর্থনীতি ও বাণিজ্য ডেস্ক:

দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি আর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ভারে চিঁড়েচ্যাপ্টা সাধারণ মানুষ। চাল-ডাল থেকে শুরু করে প্রতিদিনের কাঁচাবাজার—সবখানেই অস্বস্তির আগুন। এর মধ্যেই নতুন করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এমন সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বা বেতন বৃদ্ধির আভাস দেওয়া হয়েছে। ফলে সমাজের বৃহত্তর অংশ—বিশেষ করে বেসরকারি চাকরিজীবী, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে এক গভীর হতাশা ও বৈষম্যের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বাজারসংশ্লিষ্ট ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি হলেও সরকারি সুবিধাভোগী কর্মকর্তার সংখ্যা মাত্র সাড়ে ১৪ লাখের মতো। সরকারি বেতন বৃদ্ধির ফলে এই ক্ষুদ্র অংশের হিসাব হয়তো পালটাবে, কিন্তু এর পরোক্ষ প্রভাবে বাজারে জিনিসপত্রের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে। আর সেই মূল্যস্ফীতির বোঝা পুরোপুরি এসে পড়বে আয় না বাড়া সাধারণ মানুষের কাঁধে।

ঈদের পরেও নামেনি বাজারের উত্তাপ

রোজার ঈদে একদফা বাড়ার পর কুরবানির ঈদ ঘিরে নিত্যপণ্যের দামে যে বাড়তি তাপ লেগেছিল, তা এখনো কমেনি। বাজারে কোনো পণ্যের ঘাটতি বা সংকট না থাকলেও দাম কমার কোনো লক্ষণ নেই।

শুক্রবার (১০ জুলাই) রাজধানীর কারওয়ান বাজার, নয়াবাজার ও মালিবাগ কাঁচাবাজারসহ বেশ কয়েকটি খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে ক্রেতাদের দীর্ঘশ্বাস আর হতাশার চিত্র:

  • চাল ও ডাল: প্রতি কেজি সরু চাল বিক্রি হচ্ছে ৮৫-৯০ টাকায়, মাঝারি চাল ৬৮ টাকা এবং মোটা চালের কেজি ৫৫-৬০ টাকা। সরু দানার মসুর ডালের কেজি ছুঁয়েছে ১৬০ টাকা।
  • তেল ও পেঁয়াজ: লিটারপ্রতি বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়। সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৫০ টাকায়।
  • মাছ ও মাংস: গরুর মাংসের কেজি সর্বোচ্চ ৮৫০ এবং খাসির মাংস ১,২০০ টাকা হওয়ায় তা মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৮০-২০০ টাকা (সপ্তাহখানেক আগে ছিল ১৬০-১৮০ টাকা) এবং ফার্মের ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ১২০-১৩০ টাকায়। এছাড়া খুচরায় রুই (৪০০-৪৫০ টাকা), তেলাপিয়া (২২০-২৩০ টাকা), পাঙাশ (২০০-২২০ টাকা) থেকে শুরু করে চিংড়ি (৬০০-৮০০ টাকা)—সব ধরনের মাছের দামই চড়া।
  • সবজি: লম্বা বেগুন ৮০-৯০ টাকা, গোল বেগুন ৯০-১০০ টাকা, করলা ৬০-৭০ টাকা এবং কচুরমুখী বিক্রি হচ্ছে ৬৫-৭০ টাকা কেজিতে।

মালিবাগ বাজারে বাজার করতে আসা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কর্মী মো. হাসনাতের (৪৭) কথায় উঠে এলো সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব। তিনি বলেন, “মাসে ৩৫ হাজার টাকা বেতনে ছয় জনের সংসার চালানো এখন অসাধ্য সাধন। বেঁচে থাকার জন্য হিসাব করে অল্প অল্প পণ্য কিনতে হচ্ছে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ছে, তারা হয়তো সামলে নেবেন। কিন্তু আমাদের মতো মানুষের কী হবে?”

পরিসংখ্যান কী বলছে?

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত জুন-২০২৬ মাসের ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) অনুযায়ী, জুনে সাধারণ মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৯.১৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে (মে মাসে যা ছিল ৯.৪২ শতাংশ)। দশমিক ২৬ শতাংশ কমলেও টানা তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরেই অবস্থান করছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য কোনো বাস্তব স্বস্তি বয়ে আনতে পারেনি।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও পরামর্শ

অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীর সতর্ক করে বলেন, “সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ঘোষিত নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন হলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়বে। সাড়ে ১৪ লাখ কর্মচারীর বেতন বাড়লে মূল্যস্ফীতিই শুধু বাড়বে না, বরং বৈষম্য ও দারিদ্র্যের ঝুঁকিও তৈরি হবে। সরকারের উচিত এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়া।”

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সানেমের (SANEM) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হানের মতে, বাজারে শুধু সরকারি কর্মকর্তারা যান না, সবাই যান। তাই সরকারের মূল মনোযোগ হওয়া উচিত সমগ্র দেশের মানুষের জন্য মূল্যস্ফীতি কমানো। টিসিবির মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিক্রি আরও বাড়ানোর তাগিদ দেন তিনি।

এদিকে, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বাজার সিন্ডিকেটের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে অসাধু সিন্ডিকেট ভোক্তাদের নাজেহাল করছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রহস্যজনক কারণে নিশ্চুপ। সরকারি চাকরিজীবীরা পে-স্কেলের সুবিধার কারণে টিকে থাকতে পারলেও বাকি জনগণের জন্য এটি ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’। এই বৈষম্য দূর করতে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর বাজার নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা জরুরি।”

Share This News