দহগ্রাম সীমান্তে চরম উত্তেজনা: বিজিবির রণপ্রস্তুতির মুখে বেড়া নির্মাণ বন্ধ করল বিএসএফ

লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম সীমান্তে আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের চেষ্টাকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) অনড় অবস্থান ও কড়া বাধার মুখে শেষ পর্যন্ত কাজ বন্ধ করে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে বিএসএফ।

শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে উপজেলার দহগ্রাম ইউনিয়নের তিনবিঘা করিডোর সীমান্তে এই ঘটনা ঘটে। বিজিবি রংপুর-৫১ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজিউর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

যেভাবে উত্তেজনার সূত্রপাত

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের প্রধান ডিএএমপি পিলার ৭-এর ৩০ নম্বর সাব-পিলার এলাকাটি তিনবিঘা করিডোর হয়ে দহগ্রাম ছিটমহলে যাতায়াতের একমাত্র পথ। স্থানীয় সূত্র ও বিজিবি জানায়, শুক্রবার সন্ধ্যায় এই শূন্যরেখার মাত্র ১০ থেকে ২০ গজের মধ্যে ভারতীয় একাধিক দপ্তরের কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের নিয়ে পরিমাপ শুরু করে বিএসএফ। আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন অমান্য করে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের উদ্দেশে তারা ৩ থেকে ৪ ফুট উচ্চতার বাঁশের খুঁটি স্থাপন করতে থাকে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ১৭৪ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের ভীম ক্যাম্পের অন্তত ৭০-৮০ জন সশস্ত্র সদস্যের পাহারায় ৩০-৩৫ জন ভারতীয় নাগরিক ও শ্রমিক এই নির্মাণকাজ চালাচ্ছিল। বিজিবিকে পূর্বানুমতি বা তথ্য না জানিয়ে হঠাৎ এই কাজ শুরু করায় পানবাড়ী কোম্পানির বিজিবির কমান্ডার সুবেদার সোলেমান আলী তাৎক্ষণিক টহল দল নিয়ে ঘটনাস্থলে যান এবং তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন।

মুখোমুখি অবস্থানে দুই বাহিনী

বিজিবির আপত্তি উপেক্ষা করে বিএসএফ কাজ চালিয়ে যেতে থাকলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে বিজিবি কড়া সতর্কবার্তা দিয়ে সীমান্তে ৪ থেকে ৫টি সেকশনে ভাগ হয়ে ভারী অস্ত্র নিয়ে সম্পূর্ণ প্রতিরোধমুখী অবস্থান (পজিশন) নেয়। বিজিবির এমন রণপ্রস্তুতি দেখে বিএসএফও পাল্টা অবস্থান নিলে সীমান্তে এক যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

টেলিফোন আলাপে পরিস্থিতি শান্ত

উত্তেজনাকর এই পরিস্থিতিতে রাত সাড়ে ৮টায় বিজিবি ও বিএসএফের ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে জরুরি টেলিফোন আলাপ অনুষ্ঠিত হয়। ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল নাজিউর রহমান এবং ভারতের ১৭৪ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের কমান্ড্যান্ট ভিনোদ রেধু এতে অংশ নেন।

আলাপকালে বিএসএফ সীমান্তে উত্তেজনা নিরসনে তাদের বিতর্কিত কাজ স্থগিত করার আশ্বাস দেয়। এরপর ঘটনাস্থল থেকে উভয় বাহিনীর সদস্যরা নিজ নিজ ক্যাম্পে ফিরে গেলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।

স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক

মুহূর্তের মধ্যে এই ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে দহগ্রাম ইউনিয়নের সাধারণ বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ দেখা দেয়। স্থানীয় বাসিন্দা মনিরুজ্জামান মনির জানান, বিএসএফের হঠাৎ বেড়া দেওয়ার চেষ্টা এবং বিজিবির বাধায় যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল, তাতে সীমান্তের মানুষের মধ্যে এখনো উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।

বিজিবির কঠোর হুঁশিয়ারি ও পূর্বের ঘটনা

বিজিবি রংপুর-৫১ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজিউর রহমান বলেন, “সীমান্ত আইন না মেনে বিএসএফ শূন্যরেখায় কোনো কাজ করলে বিজিবি তা কোনো অবস্থাতেই মেনে নেবে না। বিজিবির কঠোর বাধায় তারা কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।”

তিনি আরও জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে শনিবার ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে একটি পতাকা বৈঠকের (ফ্ল্যাগ মিটিং) আহ্বান জানানো হলেও বিএসএফ তাতে সাড়া দেয়নি। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

উল্লেখ্য, এর আগে গত ১৮ মে ডিএএমপি পিলার ৬-এর ১৬ নম্বর সাব-পিলারের কাছে ভারতের তরুণ ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্যরা একইভাবে আন্তর্জাতিক নিয়ম ভেঙে বেড়া নির্মাণের চেষ্টা চালিয়েছিল।

Share This News