উচ্চস্বরে গান বাজিয়ে চলত নির্যাতন: বাবার নির্মম আঘাতে প্রাণ গেল নির্জনার

১২ জুলাই, ২০২৬

বাবার নির্মম আঘাতের আগে নির্জনার শেষ আর্তনাদ ছিল— “বাবা, তুমি আমাকে আর মেরো না।” কিন্তু সেই করুণ আকুতিও গলাতে পারেনি পাষাণ বাবার হৃদয়। আদরের একমাত্র সন্তান যে আর কিছুক্ষণ পরই চিরতরে হারিয়ে যাবে, সে উপলব্ধি তার ছিল না। ক্রমাগত আর অমানসিক নির্যাতনে একসময় মৃত্যুর কোলেই ঢলে পড়ে মেয়েটি। মৃত্যুর পর নিজের অপকর্ম ঢাকতে প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে মেয়ের মরদেহ শহরতলির প্রান্তিকা আবাসিক এলাকায় ফেলে দিয়ে আসে বাবা আকাশ।

খুলনা নগরীর বসুপাড়া বাঁশতলা এলাকার এই লোমহর্ষক ঘটনায় এখন এলাকাবাসীর মনে তীব্র ক্ষোভ ও শোকের ছায়া। ঘাতক বাবা আকাশ এখনও পলাতক থাকায় তার দ্রুত গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ২৬ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর অফিসের সামনে মানববন্ধন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। শুক্রবার রাতে ময়নাতদন্ত শেষে পুলিশ মরদেহ নিহতের চাচা ও দাদার কাছে হস্তান্তর করে এবং শনিবার বাদ ফজর কেসিসির নিরালা কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

ভালোবাসাই কি কাল হলো?

এলাকাবাসী ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, পরিবারের ক্রমাগত মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন থেকে বাঁচতে নির্জনা এর আগে দু’বার বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল। কিন্তু প্রতিবারই মিথ্যা আশ্বাস ও ভালোবাসার অভিনয় করে তাকে ফিরিয়ে আনা হয়। সর্বশেষ গত ১৭ এপ্রিল পরিবারের অমতে সে তেরখাদা উপজেলার আজগড়া গ্রামের মোস্তাফিজুর রহমান রনিকে ভালোবেসে বিয়ে করে।

স্বামীর সাথে ১৫ দিনের সুখের সংসার করার পর ফের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে তাকে বাবার বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু ছেলেটির আর্থিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় নির্জনার বাবা-মা এই বিয়ে মেনে নেয়নি। শুরু হয় স্বামী রনির সাথে বিচ্ছেদ ঘটানোর জন্য ভয়াবহ চাপ ও নির্যাতন। এলাকাবাসী যাতে চিৎকার শুনতে না পায়, সেজন্য ঘরে উচ্চস্বরে গান চালিয়ে তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হতো। এমনকি স্বামী দেখা করতে এলেও তাকে দেখা করতে দেওয়া হতো না।

হত্যাকাণ্ডের সেই অভিশপ্ত দিন

বাবার অমানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে গত বুধবার সকাল সোয়া ১০টার দিকে নির্জনা স্বামীর কাছে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং বাড়ি থেকে বেরিয়েও পড়ে। কিন্তু মাঝপথেই তাকে রাস্তা থেকে ধরে ফেলে পরিবারের লোকজন। এরপর প্রকাশ্যে মারতে মারতে তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

সারাদিন ধরে চলে বর্বরোচিত নির্যাতন। সন্ধ্যার দিকে আবারও ঘরে উচ্চস্বরে গান বাজিয়ে আকাশ তার মেয়েকে নির্মমভাবে পেটাতে শুরু করে। একপর্যায়ে নিস্তেজ হয়ে চিরতরে থেমে যায় নির্জনার নিশ্বাস।

লাশ গুমের চেষ্টা ও পলায়নের নাটক

মেয়ের মৃত্যুর পর বাবা আকাশ ও মা সীমার মধ্যে কোনো অনুশোচনা বা ভয় কাজ করেনি। রাত ৮টার দিকে একটি প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে নির্জনার মরদেহ মোটরসাইকেলে করে প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর সড়কের একটি বাড়ির সামনে ফেলে রেখে আসে আকাশ। রাতটা তারা স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের বাড়িতে কাটায়। পরদিন সকালে ফেসবুকে নির্জনার লাশের ছবি ছড়িয়ে পড়লে দুপুরের দিকে তারা অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়।

প্রতিবেশীদের বর্ণনা

বসুপাড়া মেইন রোডের ৮৯ নম্বর ‘নির্জনা নীড়’ বাড়িটিতে এখন সুনসান নীরবতা। বাড়ির সামনে হাঁসের পরিচর্যা করছিলেন ষাটোর্ধ্ব প্রতিবেশী আসমা বেগম। তিনি বলেন, “পান থেকে চুন খসলেই মেয়েটিকে মারত তার বাবা। বুধবার সকালেও তাকে ধরে এনে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। সন্ধ্যার একটু আগে মেয়েটির শেষ কথা শুনতে পেয়েছিলাম— ‘আর আমাকে মেরো না।’ এরপর আর কোনো শব্দ পাইনি। মাগরিবের পর বাড়ির সব লাইট বন্ধ হয়ে যায় এবং রাতে আকাশ বস্তায় করে কিছু একটা মোটরসাইকেলে নিয়ে বেরিয়ে যায়।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক প্রতিবেশী জানান, আকাশ দীর্ঘদিন ধরেই মাদক সেবন ও কারবারের সাথে যুক্ত। তার উগ্র আচরণের কারণে ভয়ে এলাকার কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পেত না।

ইতিমধ্যে সন্তান হত্যার দায়ে নির্জনার মা সীমা বেগমকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে ঘাতক বাবা আকাশকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

Share This News