শিশু মৃত্যুর দায়ভার কার? রাজনৈতিক দ্বিচারিতা।


২০২৪ সালের আগস্টের গণ-আন্দোলনে যে শিশুরা প্রাণ হারিয়েছে, তাদের মৃত্যু অবশ্যই বেদনাদায়ক। UNICEF-এর তথ্য অনুসারে অন্তত ৩২ জন শিশু নিহত হয়েছে, অন্যান্য সূত্রে সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। সেই সময়ের সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের জন্য এই মৃত্যুর দায় অনেকাংশে সেই সরকারের উপর বর্তায়। নতুন অন্তর্বর্তী সরকার এসে সেই ঘটনায় মামলা দায়ের করে পূর্ববর্তী সরকারকে দায়ী করেছে, যা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। শিশু হত্যার বিচার হওয়া উচিত।

আজকের বাস্তবতায়। বর্তমানে (২০২৬) বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাবে আজ পর্যন্ত ৩০০ শতাধিক এর বেশি শিশু প্রাণ হারিয়েছে। WHO ও স্থানীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এর মূলে রয়েছে টিকার ঘাটতি ও ইমিউনাইজেশন কভারেজের ব্যাপক পতন (২০২৫ সালে মাত্র ৫৯% এর কাছাকাছি)। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি টিকা ক্রয়ের পরিবর্তে ওপেন টেন্ডার পদ্ধতিতে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সূত্রগুলো (যেমন Science জার্নাল) জানিয়েছে। UNICEF আগেই সতর্ক করেছিল, কিন্তু সেই সতর্কতা উপেক্ষিত হয়।

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই ২০২৪-এর আন্দোলনকে “meticulously designed” (সুনিপুণভাবে পরিকল্পিত) বলে অভিহিত করেছেন। যদি সেই আন্দোলন পরিকল্পিত হয়ে থাকে এবং শিশু মৃত্যুর দায় পূর্ববর্তী সরকারের ঘাড়ে চাপানো হয়, তাহলে বর্তমান শিশু মৃত্যুর দায় কেন অন্তর্বর্তী সরকার এড়িয়ে যাবে? প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ফলে যদি টিকা না আসে, ইমিউনাইজেশন কর্মসূচি ভেঙে পড়ে, তাহলে সেই দায় কি শুধু “পরিস্থিতির” উপর চাপিয়ে দেওয়া যায়?

এখানেই রাজনৈতিক দ্বিচারিতার প্রশ্ন।
এক সরকারের সময়ে শিশু মৃত্যু = অপরাধ, মামলা, বিচারের দাবি।
আরেক সরকারের সময়ে শিশু মৃত্যু = “দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা” বা “প্রক্রিয়াগত জটিলতা”।

শিশুর জীবন কি রাজনৈতিক দল বা সরকারের পরিচয়ের উপর নির্ভর করে? প্রতিটি শিশুর মৃত্যুই জাতির ব্যর্থতা। যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় অবহেলা বা ভুল সিদ্ধান্তের জন্য জবাবদিহিতা থাকা উচিত। একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ, টিকা ক্রয়ের সিদ্ধান্তের ত্রুটি এবং দায়ীদের চিহ্নিত করা উচিত, ঠিক যেভাবে ২০২৪-এর ঘটনায় তদন্ত হয়েছে।

আমরা যদি সত্যিকারের “দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র” বা নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই, তাহলে ন্যায়বিচার হতে হবে সবার জন্য সমান। শিশুদের প্রতি দায়িত্ব কোনো সরকারের জন্য ব্যতিক্রম হতে পারে না। পূর্ববর্তী সরকারের ভুলের সমালোচনা করলে বর্তমানের ভুলকেও চোখ বন্ধ করে এড়িয়ে যাওয়া চলবে না। এটাই ন্যায়ের পথ।

শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ। তাদের মৃত্যুকে রাজনৈতিক অস্ত্র বানানোর পরিবর্তে, প্রতিটি মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রতিরোধের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে সব রাজনৈতিক শক্তিকে।

@কাজী মোহাম্মদ হাসিবুল হক

Share This News