খুলনায় সিসা দূষণ প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক র‍্যালি

বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬ উৎযাপন

পিওর আর্থ ও আর্থ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগ, স্থানীয় সহযোগিতায় সিয়াম

খুলনা, ১৮ জুলাই ২০২৬: “সিসা দূষণ বন্ধ করি, সুস্বাস্থ্য ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করি” — এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে খুলনায় একটি বর্ণাঢ্য জনসচেতনতামূলক র‍্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা পিওর আর্থের সহযোগিতায় এবং আর্থ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে স্থানীয় আয়োজক ও সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে সোশ্যাল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইনক্রিজিং অ্যানালাইসিস মুভমেন্ট (সিয়াম)

দেশের আটটি বিভাগে একযোগে আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী এই প্রচারণার অংশ হিসেবে শনিবার সকাল ১১টায় খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে থেকে র‍্যালিটি শুরু হয়। নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে র‍্যালিটি গিয়ে শেষ হয় শহীদ হাদিস পার্কে।

র‍্যালিতে অংশ নেন প্রায় ষাটজন স্বেচ্ছাসেবী, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, যুব ও নাগরিক সমাজ সংগঠনের প্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা, পরিবেশ ও মানবাধিকারকর্মী এবং গণমাধ্যমকর্মীসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। অংশগ্রহণকারীদের হাতে দেখা যায় সিসা দূষণবিরোধী ব্যানার, ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড। পুরো র‍্যালি জুড়ে “সিসা দূষণ বন্ধ হলে, বাড়বে শিশু বুদ্ধি-বলে”সহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে রাজপথ।

আলোচনা সভা ও বক্তাদের মতামত

র‍্যালি শেষে শহীদ হাদিস পার্ক চত্বরে অনুষ্ঠিত হয় একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা। সিয়ামের নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট মো. মাসুম বিল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আর্থ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট সৈয়দ নাজমুল আজম আলিফ এবং রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট সাবিল আহমেদ।

কর্মসূচিতে সিয়ামের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন সংস্থার প্রজেক্ট ডিরেক্টর মোস্তাফিজুর রহমান শাকিল, এইচআর অ্যান্ড অ্যাডমিন মো. সাকিব রহমান, কমিউনিকেশন অফিসার রাজীব সাহা এবং অ্যাডভোকেট এনায়েত হোসেন।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন অ্যাক্টিভ সিটিজেন প্ল্যাটফর্মের সভাপতি ওমর ফারুক কচি, খুলনা সাইক্লিস্টের অ্যাডমিন মাহাথির মোহাম্মদ অথৈ, আনিম নাঈম খান, মানবাধিকারকর্মী এস এম জি নেওয়াজ, শিক্ষাবিদ শাহেলা সুলতানা এবং ডাচ-বাংলার প্রোগ্রাম লিড কাজী হাসিবুল হক প্রমুখ।

যুবসমাজকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে আর্থ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের যুব বিষয়ক ও রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট সাবিল আহমেদ বলেন, “বাংলাদেশে সিসা দূষণ মোকাবিলায় যুবসমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রমাণভিত্তিক উদ্যোগে সম্পৃক্ততা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের মাধ্যমে তরুণরাই একটি নিরাপদ, সুস্থ ও সিসামুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।”

দেশে সিসা দূষণের ভয়াবহ চিত্র

বক্তারা আরও বলেনঃ বিশ্বে সিসা দূষণে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে প্রায় ৪ জনের রক্তেই মাত্রাতিরিক্ত সিসার উপস্থিতি রয়েছে।

শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে গবেষণায় বলা হয়, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশের রক্তে সিসার মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) নির্ধারিত রেফারেন্স সীমা, প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রামের চেয়ে বেশি। বিভাগভিত্তিক হিসাবে সর্বোচ্চ ৬৫ শতাংশ শিশুর রক্তে উচ্চমাত্রার সিসা পাওয়া গেছে ঢাকায়, এরপর সিলেটে ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৪২ দশমিক ১ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সামান্য পরিমাণ সিসাও শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে মারাত্মক বাধা সৃষ্টি করে। এর ফলে শিশুর বুদ্ধিমত্তা (আইকিউ) কমে যাওয়া, স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগের ঘাটতি, শারীরিক বৃদ্ধিতে বাধা এবং আচরণগত পরিবর্তন, যেমন খিটখিটে মেজাজ বা উচ্ছৃঙ্খলতা দেখা দিতে পারে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এটি হৃদরোগ ও কিডনি জটিলতাসহ নানা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়।

দূষণের প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে দৈনন্দিন ব্যবহৃত দেয়ালের রং, অ্যালুমিনিয়াম ও সিরামিকের বাসনপত্র, পানির পাইপ, মসলা, প্রসাধনী ও খেলনায় সিসার উপস্থিতি। এছাড়া বাংলাদেশে সিসা দূষণের অন্যতম প্রধান উৎস পুরাতন সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারির অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত রিসাইক্লিং। বর্তমানে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যাটারি অনিয়ন্ত্রিতভাবে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা হয়, যা সরাসরি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যে বিষাক্ত সিসা ছড়িয়ে দিচ্ছে।

সিসা দূষণ রোধে পাঁচ দফা সুপারিশ

আলোচনা সভার শেষ পর্যায়ে সিসা দূষণ প্রতিরোধে সরকার, নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের প্রতি পাঁচ দফা সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়:

১. আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন: সিসাকে বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য (Hazardous Substance) হিসেবে ঘোষণা করে জাতীয় পর্যায়ে সিসা দূষণ প্রতিরোধে একটি সমন্বিত কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। বিদ্যমান আইন ও নীতিমালা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়ন ও তার কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

২. নিয়মিত মনিটরিং ও মানদণ্ড নির্ধারণ: জাতীয় পর্যায়ে রক্তে সিসার মাত্রা নিয়মিত পরীক্ষার ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যেখানে অগ্রাধিকার পাবে শিশু ও গর্ভবতী নারীরা। পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যেমন বাসনপত্র, রং, খেলনা ও খাদ্যদ্রব্য উৎপাদনে সিসার ব্যবহার বন্ধে নিরাপদ মানদণ্ড নির্ধারণ ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।

৩. নিরাপদ রিসাইক্লিং ও সার্কুলার অর্থনীতি: অবৈধ ব্যাটারি রিসাইক্লিং সম্পূর্ণ বন্ধ করে পরিবেশবান্ধব সার্কুলার অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে। ব্যবহৃত সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারির সংগ্রহ ও ট্রেসেবিলিটি, যেমন আরএফআইডি বা ডিজিটাল রেজিস্ট্রি নিশ্চিত করে ব্যাটারি খাতকে “বর্ধিত উৎপাদক দায়িত্ব” (ইপিআর)-এর আওতায় আনতে হবে।

৪. দূষিত এলাকা চিহ্নিতকরণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি: সিসা দূষিত এলাকাগুলো চিহ্নিত করে পরিবেশ পুনর্বাসন ও নিয়মিত নজরদারি চালাতে হবে। এ বিষয়ে গবেষণা জোরদার করার পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা, স্বাস্থ্যকর্মী ও যুব প্রতিনিধিদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

৫. সমন্বিত জনসচেতনতা: সরকার, শিল্পখাত, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে সিসা দূষণের উৎস, ঝুঁকি ও প্রতিরোধ বিষয়ে দেশব্যাপী ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে।

সবশেষে উপস্থিত সকলে সিসা দূষণ রোধে একসঙ্গে কাজ করার শপথ নেন এবং সিয়ামের নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট মো. মাসুম বিল্লাহর সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এই সচেতনতামূলক কার্যক্রমের সফল সমাপ্তি ঘটে।

Share This News